বঙ্গবন্ধু তথ্য সার্চ ইঞ্জিন

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্য সার্চ ইঞ্জিন

৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ডাক দেয়ার পাশাপাশি, এদিন আরাে একটা অসাধারণ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলাে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনের সামনে, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) উদ্যোগে। ওইদিন পূর্ব বাংলার ছাত্র-যুবকরা ডামি রাইফেল কাঁধে নিয়ে সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণে অংশ নেয় এবং তাদের সাথে ছাত্রীরাও মার্চপাস্টে অংশগ্রহণ করে। একই দিন ন্যাপ (ওয়ালী)-এর পূর্বাঞ্চলীয় শাখাপ্রধান অধ্যাপক মােজাফফর আহমদ প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় গণমুক্তি বাহিনী গঠন করে মুক্তির সংগ্রাম শুরু করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান। এ পর্যায়ে দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়কোচিত একটা পদক্ষেপ নেন বঙ্গবন্ধু, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নূরুল উল্লাহকে ডেকে তাকে বেতারের ট্রান্সমিটার তৈরি করার দায়িত্ব দেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির তড়িৎকৌশল বিভাগের প্রধান ড. জহুরুল হকের তত্ত্বাবধানে ৯ দিন কাজ করার পর প্রত্যাশিত ট্রান্সমিটারটি তৈরি করা হয়। (বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৪২২-৪২৩)। অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্নমত পােষণ করে তৎকালীন ছাত্রনেতা আবদুল কুদুস মাখন বলেছেন, ১৯৭০ সালে বঙ্গবন্ধু নাকি আখাউড়া শাখার দুই আওয়ামী লীগ নেতা লাল মিয়া ও গােলাম রফিককে একটি বেতারকেন্দ্র স্থাপন বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ভারতে পাঠিয়েছিলেন। আর তাদের অভিজ্ঞতাই নাকি প্রথম বেতার কেন্দ্র স্থাপনে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।

৯ মার্চ পল্টনের জনসভায় মওলানা ভাসানী তার অবস্থান সুস্পষ্ট করে বলেন, পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হইবে, পাকিস্তান অখণ্ড থাকিবে না, অখণ্ড রাখিব না। ইয়াহিয়ার বাপেরও ক্ষমতা নাই ইহা ঠেকায়।’ তিনি আরাে বলেন, আমি শেখ মুজিবকে আমার তিন পুত্রের চেয়েও ভালােবাসি। আমার রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে ৩১ জন সেক্রেটারির সাথে কাজ করেছি। তাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানই শ্রেষ্ঠ। সেক্রেটারি।’ এ জনসভায় কিছু কর্মী ‘স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা, মওলানা ভাসানী-ভাসানী’ বলে শ্লোগান দিতে থাকে। ফলে একই সময়ে, একই উদ্দেশ্যে আন্দোলনরত দুটি দলের ‘দুইজন জাতির পিতার ঘােষণায় যথেষ্ট বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এদিন নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়, এতে জাতীয় সরকার গঠনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে অনুরােধ করা হয় এবং পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’-এর পরিবর্তে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নাম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই দিন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির দুই অংশ (মণি সিংহ এবং আবদুল হক-মােহাম্মদ তােয়াহা নেতৃত্বাধীন) পৃথক পৃথকভাবে দুটি লিফলেট প্রচার করে; লিফলেটের বক্তব্যে মত ও পথের ভিন্নতা থাকলেও উভয় পক্ষের দাবি ছিল একটাই—‘সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ ও জাতিকে মুক্তি এনে দিতে হবে।’

ইতােমধ্যে পূর্ব বাংলা যেন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হয়ে গেছে। শহর থেকে উপশহর, বাজার থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সর্বত্র একই আলােচনা, দেশ কি সত্যি সত্যিই স্বাধীন হতে পারবে? ইয়াহিয়া-ভুট্টো-টিক্কা মিলে সবুজ শ্যামল ভূখণ্ডটাকে শ্মশান বানিয়ে ফেলবে না? ওদের আছে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী, ভারী ভারী অস্ত্র, আছে যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ—আমাদের কাছে কী আছে, বাঁশের লাঠি আর দেশপ্রেম ছাড়া? তবে হ্যা, আমাদের একজন অকুতােভয়, দেশপ্রেমিক নেতা আছেন বটে—যিনি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার চেয়েও বড় জাদুকর, হাতের ইশারায় বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতাকে একই সুতােয় গাঁথতে পারেন, প্রাণ উৎসর্গের নিঃসঙ্কোচ প্রেরণা জোগাতে পারেন—কিন্তু কেবল প্রাণ উৎসর্গ করলেই তাে স্বাধীনতা আসবে না, এর জন্য শত্রুকে তাড়াতে হবে, কেউটেদেরকে নির্বংশ করতে হবে, সেই শক্তি কোথেকে পাবেন তিনি? কিন্তু শক্তি যদি তার না-ই থাকবে, তাহলে ইয়াহিয়াভুট্টোকে চ্যালেঞ্জ জানালেন কী করে? গণমানুষের নেতা হয়ে, তিনি নিশ্চয়ই তার সমর্থকদের পিশাচের সামনে ঠেলে দেবেন না। তাছাড়া আমরা, মানে তার সমর্থকরা—নিরস্ত্র হতে পারি, কিন্তু মনের শক্তি কি নেই? সেই শক্তি আর দেশপ্রেম নিয়ে তাঁর পাশে তাে দাঁড়াতে পারি; তিনি তাে বলেই দিয়েছেন, ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ আমাদের উচিত নয় প্রস্তুত হয়ে থাকা? তিনি যদি ইয়াহিয়া, টিক্কাতে ভীত না হন, প্রাণ উৎসর্গ করতে ভয় পান, তাহলে আমরা ভয় পাব কেন? মাসুদুল হকের বর্ণনায়, ৭ মার্চের ভাষণ ‘প্রতিটি মুক্তিযােদ্ধার কাছে হয়ে যায় স্বাধীনতার ডাক।

৬ দফা ঘােষণার মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটান, তা প্রতিটি মুক্তিযােদ্ধাকে করে তােলে একেকটি মুজিব। তাদের হাতের রাইফেলের নাম হয়ে যায় মুজিব। বর্বর পশুশক্তির বুলেটবিদ্ধ প্রতিটি বাঙালির নাম হয়ে যায় মুজিব। এখানে মুজিব অনন্য, অসাধারণ, তার পাশে দাঁড় করানাে যায় না কাউকে। তিনি যেন এক আকাশছোঁয়া মানুষ হয়ে গেছেন।’ (পৃ. ১৮০)। | ১০ মার্চ, নিউ মার্কেট সংলগ্ন এক পথসভায় অধ্যাপক মােজাফফর আহমদ পাকসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সবাইকে উদাত্ত আহ্বান জানান। গণহত্যার প্রতিবাদে শিল্পী মুর্তজা বশীর সরকারি চিত্র প্রদর্শনী বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘােষণা করেন। নিউইয়র্ক প্রবাসী বাঙালিরা জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে সংস্থারটির মহাসচিব উথান্টের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। নারায়ণগঞ্জের সিনেমা হলগুলােতে বিনা টিকেটে দেশাত্মবােধক চলচ্চিত্র দেখানাে হতে থাকে।

হাইকোর্টসহ সকল সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান-বর্জন অব্যাহত থাকে। শহীদদের স্মরণে সকল অফিসে কালাে পতাকা উত্তোলন করা হয়। ইতােমধ্যে পাক সরকার সামরিক অধ্যাদেশ (১১৫ ধারা) জারি করে সকল কর্মকর্তাকর্মচারীকে নিজ নিজ কর্মস্থলে যােগ দেয়ার নির্দেশ প্রদান করে। কিন্তু তাতে তেমন সাড়া মেলেনি। ১৪ মার্চ ‘আর সময় নাই’ শিরােনামে ঢাকার সকল সংবাদপত্র মিলে একটি অভিন্ন প্রতিবাদী সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। এ দিনই ভুট্টো পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। তার এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সমাজের একাংশের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পাকিস্তানের সংহতি বিনষ্ট করার জন্য মুজিব নন, ভুট্টোই একের পর এক ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন। তার এ বক্তব্য খােদ পশ্চিম পাকিস্তানেই সমালােচনার ঝড় তােলে। সেখানকার অধিকাংশ রাজনীতিক ভুট্টোর বক্তব্যের বিরােধিতা করে তাকে ক্ষমতালােভী, ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিহিত করতে থাকেন। | ১৫ মার্চ দুপুর আড়াইটায় ইয়াহিয়া খান উর্দিপরা বিভিন্ন পদবির লােকজন নিয়ে ঢাকায় এলেন। শেখ মুজিবের সাথে একের পর এক বৈঠক করে চললেন। বাস্তবিকপক্ষে আলােচনার নামে ইয়াহিয়া তখন কালক্ষেপণ করে যাচ্ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য, অস্ত্র, গােলাবারুদ আনার জন্যে সময় নিচ্ছিলেন এবং বাঙালিকে শায়েস্তা করার জন্য জেনারেল পরিবেষ্টিত হয়ে ছক কষছিলেন। ইয়াহিয়ার দুরভিসন্ধি কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাই তিনি ১৯ মার্চ কর্নেল এম এ জি ওসমানীকে ডেকে সশস্ত্র সংগ্রামের খুঁটিনাটি দিক নিয়ে আলােচনায় বসেছিলেন। এ সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক অফিসার গােপনে এসে দেখা করতেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে। ২১ মার্চ ১২ জন উপদেষ্টাকে সাথে নিয়ে ভুট্টোও ঢাকায় এলেন।

তিনি গােপন বৈঠকে বসেন ইয়াহিয়ার সাথে। এরপর প্রহসনধর্মী আলােচনা আরাে চলল, কিন্তু মুজিব তার ন্যায্য দাবি আদায়ে অনড় থাকায় এবং ভুট্টো ক্ষমতার লােভে যুক্তি বিসর্জন দেয়ায়—আলােচনাতে কোনাে অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। ( ২৩ মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবস, ইয়াহিয়া-ভুট্টো ঢাকায় অবস্থান করার পরও—বঙ্গবন্ধু নিজ উদ্যোগে ওই দিনটিকে ছুটি ঘােষণা করেন। কাকডাকা ভাের থেকে আমার সােনার বাংলা আমি তােমায় ভালবাসি প্রস্তাবিত জাতীয় সঙ্গীত দিয়ে দিবসটির সূচনা হয়। ভাের পাঁচটায় বঙ্গবন্ধু তার ভবনে নিজ হাতে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করেন। সকাল ৯টায় পল্টন ময়দানে জয় বাংলা বাহিনী। কুচকাওয়াজ ও মহড়া শুরু করে। ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে তারা যায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। সেখানে বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং বলেন, “গত বাইশ দিনের অসহযােগ আন্দোলনে ক্ষমতাসীন চক্রের মাজা ভেঙে দিয়েছি। বাংলাদেশে যাতে একটিও শশাষণকারী থাকতে না পারে সেজন্য ব্যাপক আন্দোলন অব্যাহত রাখা হবে।’ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দিনটিকে পালন করে প্রতিরােধ দিবস’ হিসেবে। ভাসানী ন্যাপ পালন করে স্বাধীন পূর্ব বাংলা দিবস’ হিসেবে, (ওইদিন পল্টনের জনসভায় ভাসানী আসেননি; তিনি নাকি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তবে এটা যে তাঁর রাজনৈতিক অসুস্থতা, এ বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন সবাই) বাংলা জাতীয় লীগ (অলি আহাদ) পালন করে স্বাধীন বাংলাদেশ’ দিবস হিসেবে। এদিন ঢাকার সর্বত্র, এমনকি বিদেশি দূতাবাসে, হােটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেও (যেখানে ভুট্টো তার সঙ্গীদের নিয়ে উঠেছিলেন) বাংলাদেশের নতুন পতাকা পতপত করে উড়ছিল।

ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিক পরের দিন আবেগসঞ্জাত শিরােনাম করেছিল A new Flag is born. affuef farcisa: A new flag is born today- a flag with a golden map of Bangladesh implanted on a red circle placed in the middle of deep green rectangle base. This is the latest flag added to the total list of the flags representing various states and nations of the contemporary world. This is the flag for ‘independent Bangladesh’. This is the flag that symbolizes the emancipation of 75 million Bangalees. (The People, Dacca). ( ২৩ মার্চ সৈয়দপুরে, অবাঙালি অনুচরদের নিয়ে পাকসেনারা নিরীহ বাঙালি জনগােষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়। নিহত হন ৫০ জন বাঙালি। রংপুরে প্রত্যন্ত গ্রামে ঢুকে পাকবাহিনী তাণ্ডব শুরু করে দেয়। ২৪ মার্চ চট্টগ্রামবাসীর কাছে খবর পৌছল যে, বন্দরে এম. ভি. সােয়াত নামে অস্ত্রবােঝাই একটি জাহাজ ভিড়েছে এবং সেখান থেকে অস্ত্র খালাস করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। খবরটা শােনামাত্র হাজার হাজার জনতা বন্দর এলাকা ঘিরে ফেলে এবং অস্ত্রের চালান যাতে শহরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে রাখে, বেশ কয়েকটা ব্রিজ নষ্ট করে ফেলে। জনতার প্রতিরােধ ভাঙার জন্য সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি ছােড়ে, তাতে বেশ ক’জন প্রতিরােধকারী শাহাদতবরণ করেন। এদিন বঙ্গবন্ধুর বাসার সামনে জনতার ঢল নামে, নেতা সবাইকে আশ্বস্ত করেন, অন্য কেউ শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানি করতে পারে, কিন্তু আমি তা করব না। সন্ধ্যের একটু আগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনটি হেলিকপ্টার আকাশে উড়ল। একটির যাত্রী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, তিনি যাবেন যশাের ক্যান্টনমেন্টে; দ্বিতীয়টিতে আছেন মেজর জেনারেল খাদিম হােসেন রাজা, তিনি কুমিল্লা হয়ে চট্টগ্রামে যাবেন।

তৃতীয় হেলিকপ্টারে আছেন তিন জন সিনিয়র অফিসার, তারা প্রথম যাবেন সিলেটে, সেখান থেকে রাজশাহী ও রংপুর ক্যান্টনমেন্টে। হেলিকপ্টারের যাত্রীদের উদ্দেশ্য একটাই—‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর প্রয়ােগকৌশল সম্পর্কে বিভিন্ন সেনানিবাসের অধিনায়কদের নির্দেশনা দিয়ে আসা (বাঙালি হত্যা ও পাকিস্তানের ভাঙ্গন, পৃ. ১৬৭)।

[বি. দ্র. : মার্চের উত্তাল দিনগুলাে—ব্যক্তি ইয়াহিয়া খান এবং তার সরকার কর্তৃক প্রকাশিত শ্বেতপত্রে (প্রকাশকাল : জুলাই, ‘৭১) উল্লিখিত হয়েছে। যেভাবে :

০৩ মার্চ : আওয়ামী লীগের নির্দেশমতাে ঢাকার রেডিও এবং টেলিভিশন নতুন এক বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত প্রচার করতে শুরু করে।

০৭ মার্চ : যশােরে ডেপুটি কমিশনারের অফিসে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার জায়গায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

১৪ মার্চ : শেখ মুজিব আগের সব নির্দেশ বাতিল করে দেন এবং ১৫ মার্চ থেকে নতুন নির্দেশ সংবলিত কার্যক্রম ঘােষণা করেন। এর একটি নির্দেশে জেলা প্রশাসন ও মহকুমা হাকিমদের আওয়ামী লীগ সংগ্রাম পরিষদের সাথে ঘনিষ্ঠ যােগাযােগ ও সহযােগিতার কথা বলা হয়েছে।

২৩ মার্চ : ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি ভবনের চূড়ায় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকার পরিবর্তে ‘বাংলাদেশের পতাকা উড়তে দেখা যায়।… শেখ মুজিবুর রহমান তার বাসভবনে এক সশস্ত্র মার্চপাস্টে সালাম গ্রহণ করেন। এখানেও আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

২৫ মার্চ : শেখ মুজিবুর রহমান সাবেক কর্নেল ওসমানীকে বিপ্লবী বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন।… ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিভিন্ন বহিঃস্ফাড়ির মধ্যে ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটারের সাহায্যে যােগাযােগ প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এক ইউনিট থেকে দ্রুত অন্য ইউনিটে নির্দেশ পাঠানাে হয়।

২৬ মার্চ : বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান তার অসহযােগ আন্দোলন শুরু করে দেশদ্রোহিতামূলক কাজ শুরু করেছেন।… এই লােকটি (শেখ মুজিব) এবং তার দল পাকিস্তানের শত্রু, আর তারা পূর্ব পাকিস্তানকে দেশ থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে দেশের ঐক্য ও সংহতিকে আক্রমণ করেছেন—এ অপরাধের শাস্তি তাকে পেতেই হবে।’

সূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সত্য অসত্য অর্ধসত্য-বিনয় মিত্র

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে শেখ মুজিবের পরিবারকে অন্তরীন রাখা হয়েছিল, তার পাহারায় ছিল প্রায় এক ডজনের মত পাকিস্তানী বাহিনীর সদস্য, এই দলের প্রধান ছিলেন একজন সুবেদার মেজর। সামরিক আইন প্রশাসক দপ্তরের ব্রিগেডিয়ার কাদিরের অধীনে মেজর হোসেনের দল এই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এদের সাথে ছিল রাইফেল ও হালকা মেশিনগান। ছাদে একটি নীচতলায় একটি এবং গেটে দুটি পোস্টে তারা দায়িত্ব পালন করছিলেন। পালা করে দায়িত্ব পালন করলেও ১৬ ডিসেম্বরের দল আর পরে বদল সম্ভব হয়নি তাই এই দল ১৭ তারিখে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

১৬ ডিসেম্বর রাতে এখানে তারা গুলি চালিয়ে একজন মহিলাসহ পাঁচজন মারে। তাদের মেশিনগানের গুলিতে একজন চালক/সাংবাদিক নিহত হয় বাড়ীর গেটের সামনেই গাড়ীতে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৭৩ ব্রিগেডের ১৪ গার্ড ব্যাটেলিয়ন এর একটি কোম্পানির কম্যান্ডার ছিলেন মেজর তারা। তার ইউনিট ১৬ তারিখ দুপুরেই ঢাকা বিমান বন্দর অবরোধে দায়িত্ব পালন করছিল। মেজর তারা ৪ তারিখে গঙ্গাসাগর যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পরে বীরচক্র খেতাব পেয়েছেন । তার ইউনিটের সদস্য নায়েক আলবার্ট এক্কা পেয়েছেন এই অংশের একমাত্র পরম বীর চক্র খেতাব।

বিমানবন্দরে স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা মেজর তারার ব্যাটেলিয়ন কমান্ডার লেঃ কর্নেল বিজয় কুমার চানানার সঙ্গে দেখা করে জানায় পাকিস্তানী সেনারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে ধানমণ্ডির এক বাড়িতে আটক করে রেখেছে। সেখানে এখনও সশস্র পাকিস্তানী সৈন্য পাহারায় আছে। সময়মত উদ্ধার না করা গেলে সেখানে গুরুতর কিছু ঘটে যেতে পারে। চানানার নির্দেশে মেজর তারা তিনজন সৈনিকসহ ধানমন্ডি রওনা হন। তারা এখানে এসে দেখলেন তিনজন সৈন্য নিয়ে তাদের সাথে লড়ার কোনো সুযোগ নেই, তিনি তার জেসিওকে ডেকে তার হাতের স্টেনগানটা ধরিয়ে দিলেন। তাকে বললেন তাকে কাভার দিয়ে ওয়াল ঘেষে দাঁড়াতে। একটু এগোতেই ছাদের উপর থেকে তাদের উদ্দেশে বলা হলো আর এক পা এগুলেই গুলি করা হবে। তারা পাল্টা জবাব দিলেন যে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার এবং নিরস্ত্র। কথা বলতে চান। এরপর বললেন, ‘আমি আপনার সামনে নিরস্ত্র অবস্থায় পৌছেছি মানেই আপনাদের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করেছে। বিশ্বাস না হলে আপনার অফিসারকে জিজ্ঞাস করে দেখতে পারেন।’ সেন্ট্রি তাকে হল্ট বলে অপেক্ষা করতে বললো। একটু পর জানালো, আমি তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। তারা পরে জেনেছেন ক্যাপ্টেন পদবীর ওই অফিসার আগেই পালিয়ে যান এবং আত্মসমর্পনের খবর তার অধস্তনরা পায়নি যোগাযোগহীনতার কারণেই।
এসময় মাথার উপর ভারতীয় কিছু হেলিকপ্টার উড়ছিলো। তারা বললেন, দেখো ওপরে আমাদের হেলিকপ্টার, পেছনে দেখো আমার সৈন্যরা দাড়িয়ে। আমার মতো তোমাদেরও নিশ্চয়ই পরিবার ছেলেমেয়ে আছে। তোমরা আত্মসমর্পন করো, আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি তোমরা নিরাপদে তোমাদের ক্যাম্পে বা যেখানে যেতে চাও সেখানে যেতে পারবে। কথাগুলো বলতে বলতে এগোচ্ছিলেন তারা। এমন সময় গেটের ফাক দিয়ে ওই রাইফেলের নলটা তার বুক স্পর্শ করলো। ওই কাপতে থাকা তরুণের চোখে চোখ রেখে ছাদের উপর থাকা হাবিলদারের সঙ্গে কথা বলছিলেন তারা। এমন সময় ভেতর থেকে এক নারীকণ্ঠ ভেসে এলো “If you do not save us, they will kill all of us, we know,” যদি আমাদের না বাচান তাহলে এরা আমাদের মেরে ফেলবে। কথা বলতে বলতে তারা বুকের ওপর চেপে বসা নলটা সরিয়ে দিলেন তারা। তার বুকে কোনো ভয় নেই।

তারা পাকিস্তানীদের অবশেষে বোঝাতে সক্ষম হন। তাদের বেসামরিক পোষাক পড়তে দেওয়া হয় নইলে রাজপথে বাঙালী তরুণদের গুলির মুখে অক্কা পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। বাড়িতে ঢোকার পর বেগম মুজিব তারাকে জড়িয়ে ধরেন, এবং বলেন, ‘তুমি আমার ছেলে যাকে খোদা নিজে পাঠিয়েছেন।‘’ বাড়ির ভেতরকার দূরাবস্থা জানিয়েছেন তারা। তিনি দেখলেন ঘরে কোনো আসবাব নেই। মুজিব পরিবারের সদস্যরা মাটিতে শুতেন। আর তাদের শেষ ২-৩ দিনের খাবার দাবার বলতে ছিল কিছু বিস্কুট।

মুক্ত হওয়ার পর এই বাসায় দলে দলে বিভিন্ন স্তরের মানুষ দেখা করতে আসেন। ত্রিপুরার একদল সাংবাদিক খবর পেয়ে ছুটে আসেন তাদের দেখতে। এদের মধ্যে অনিল ভট্টাচার্য এবং রবিন সেন গুপ্ত ও ছিলেন। তাদের একজন বেগম মুজিবের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহন করেছিলেন। মেজর তারা পরে আর কিছুদিন এই পরিবারের নিরাপত্তা দেখাশুনা করেছেন। পরে বেগম মুজিব তারাকে কিছু উপহার কিনে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব ফিরে এলে তারাকে বাসায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন শেখ মুজিব। তাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন। শেখ রেহানা অনেকদিন মেজর তারার সাথে পত্র যোগাযোগ রাখতেন। ২০১২ সালে মেজর তারাকে ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ পদকে ভূষিত করা হয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
২. বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব (রেণু)
৩. শেখ কামাল (জ্যেষ্ঠপুত্র)
৪. সুলতানা কামাল (নব-বিবাহিতা পুত্রবধূ)
৫. শেখ জামাল (মধ্যম পুত্র)
৬. রোজী জামাল (নব-বিবাহিতা পুত্রবধূ)
৭. শেখ রাসেল (৮ বছরের কনিষ্ঠ পুত্র) 
৮. শেখ আবু নাসের (বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা)
৯. কর্ণেল জামিল (সােবহানবাগ মসজিদের পাশে নিহত)
১০. কর্তব্যরত পুলিশের জনৈক ডিএসপি
১১. আব্দুর রব সেরনিয়াবাত (মন্ত্রিসভার সদস্য)
১২. তারিফ সেরনিয়াবাত (সেরনিয়াবাত-এর পুত্র : ১২ বছর)
১৩. বেবী সেরনিয়াবাত (সেরনিয়াবাত-এর কন্যা : ১৪ বছর)
১৪. শহীদ সেরনিয়াবাত সেরনিয়াবাত-এর ভ্রাতুস্পুত্র)
১৫. বাবু সেরনিয়াবাত (সেরনিয়াবাত-এর দৌহিত্র : ৫ বছর)
১৬. নান্টু (সেরনিয়াবাত-এর ভাগিনেয়) ।
১৭. শেখ ফজলুল হক মণি (দৈনিক বাংলার বাণীর সম্পাদক)
১৮. বেগম শামসুন্নেসা মণি (সন্তান সম্ভবা) প্রমুখ।

সূত্রঃ মুজিবের রক্ত লাল – এম আর আখতার মুকুল

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

দোহাজারি হইতে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মান, কক্সবাজারে সরকারী কলেজ ও কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করিতে হইবে।  স্থানীয় লবণ শিল্প রক্ষার্থে করাচী হইতে লবণ আমদানির উপর বাধানিষেধ আরোপ করিতে হইবে। সকল প্রকার রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হইবে। যুদ্ধকালে দখলীকৃত জমির ক্ষতিপূরণ দেবার দাবীও জানাইতেছি। এবং সীমান্তের সহিত কক্সবাজারকে সংযোগকারী রাস্তার পুনঃনির্মান করিতে হইবে।

Reference: দৈনিক আজাদী ৭ জুন ১৯৫৫।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

Under this control, the country is in the verge of ruin. The Govt. wrongly had detained Maulana Bhasani for whose past work the Dist. of Sylhet had fallen within Pakistan. The high handedness on the part of a Police Sargent towards a school boy within the compound of a school in Chittagong town and I demand its enquiry by the magistrate and Superintendent of Police. The last Police firing on the students for taking part in the Language Movement should be investigated.I urge you to join the A.M.L. 

Reference: Hasina, S. (2018) Secret Document of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol – II, p 437, Sheikh Hasina, Hakkani Publishers

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

I call you to unite under the banner of Awami League to fight for the realization of country’s aspiration for which creation of Pakistan was aimed at, to eradicate corruption and tyranny and ensure social justice for all which could be achieved by totally eliminating the Muslim League making ducks and drakes with the destiny of masses.

Reference: Hasina, S. (2018) Secret Document of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol – II, p 327, Sheikh Hasina, Hakkani Publishers.

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

৭১ সালে ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দুত সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পল মার্ক হেনরি জাতিসংঘ সদর দপ্তরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। গত দুদিন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন। তাকে শেখ মুজিব পাকিস্তানে বাঙ্গালী নির্যাতনের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ শুনান এবং প্রতিকারের জন্য মহাসচিব বরাবর লেখা পত্র তার হাতে তুলে দেন। হেনরির এ সাক্ষাৎ দুদিন গোপন রাখা হয়েছিল।ডঃ কামাল হোসেন তার মিন্টু রোডের বাসায় তেজগাঁও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ এর বিভিন্ন পর্যায়ের কমিটির সভাপতি সাধারন সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধাদের এক কর্মীসভায় এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহবান জানিয়েছেন। সভায় আর বক্তব্য রাখেন এমসিএ হেদায়েতুল ইসলাম, বেগম সাজেদা চৌধুরী, বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ কর্মী সাহারা খাতুন।ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়াছে। আর আগে তারা স্বীকৃতি দিবে এমন তথ্য প্রকাশ করেছিল এবং তা পাকিস্তানকে অবহিত করে। পাকিস্তান তখন সে দেশে তাদের রাষ্ট্রদূতকে দেশে তলব করে। পরে জুলফিকার আলী ভূট্টো এর অনুরোধ উপেক্ষা করেই ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ইস্লামিক কনফারেন্স মহাসচিব টুঙ্কু আব্দুর রহমানের দুত বিচারপতি আব্দুল আজিজ এবং আহমদ বিন মোহাম্মদ ইয়ানুসের সাথে আলাপ করার সময় বলেছেন বিশ্ববাসী দেখে যাও এরা ইসলামের নামে এ দেশে কি করেছে। তিনি বলেন তারা যখন বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মুসলমান হত্যা করেছিল তখন কোন মুসলিম দেশ এর প্রতিবাদ করেনি। তিনি সকল মুসলিম দেশ সমুহকে বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধি পাঁঠিয়ে পরিস্থিতি সচক্ষে দেখে যাওয়ার আমন্ত্রন জানান।পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন একটি বন্ধু রাষ্ট্রের মাধ্যমে চীনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যে তারা যেন পাকিস্তানে বাঙ্গালী নির্যাতন বন্ধে পাকিস্তানের উপর প্রভাব বিস্তার করে। তিনি পরাশক্তি ফ্রান্স, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে পাকিস্তানে বাঙ্গালীদের স্বার্থ দেখতে অনুরোধ করেছেন। পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালীদের পিতা, মাতা, স্ত্রী, ভাই, বোন সমন্বয়ে একটি দল পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেছেন বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের সর্বশেষ সময় ২৫ মার্চ ধার্য থাকলেও এর অনেক আগেই এ প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। তিনি বলেন ইতিমধ্যেই প্রত্যাহারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেন অনেক শত্রু দেশ বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছিল। এ প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে তাদের অপপ্রচার বন্ধ হবে।ব্রিটিশ শ্রমিক দলীয় এমপি জন স্টোন হাউজ প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে দেখা করেছেন। বুলগেরিয়া থেকে ত্রানবাহী একটি বিমান ঢাকা এসে পৌঁছেছে। বুলগেরিয়ান রেডক্রস এসকল ত্রান সামগ্রী পাঠিয়েছে। ত্রানের মধ্যে সবই ঔষধ এবং চিকিৎসা সামগ্রী। ত্রান সামগ্রী গুলি বাংলাদেশ রেডক্রসের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠানে দেয়া হবে। এ বিমানে একটি চিকিৎসক প্রতিনিধিদলও এসেছেন। ভারত পাকিস্তানের প্রতি শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ কয়েকজন যুদ্ধাহত যুদ্ধবন্দী পাকিস্তানে ফেরত পাঠিয়েছে। 

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পিজি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন রাজনৈতিক আব্দুস সালামের স্বাস্থ্য এর খোজ খবর নেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের সকলের চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন। পরে তিনি হাসপাতাল প্রাঙ্গন ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং হাসপাতালের উত্তরপাশের খালি স্থানটি হাসপাতালের জন্য ব্যাবহার করা যায় কিনা সে বিষয়ে আলাপ আলচনা করেন। তিনি পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাবেক পিডিপি নেতা সালাম খানকে দেখতে যান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সরকার প্রধানের কাছে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালীদের নিরাপত্তা বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে প্রভাব খাটানোর জন্য অনুরোধ জানিয়ে পত্র দিয়েছেন।মুক্তিযুদ্ধ কালে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ মিশন প্রধান সেখানে তার দায়িত্ব পালন কালে তার মিশনের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের খরচ বিবরণী এবং উদ্বৃত্ত অর্থ ৬ লাখ টাকা সরকারী কোষাগারে জমা দেয়ার লক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কাছে হস্তান্তর করেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

এদিন পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালীদের পরিবারের একটি দল সাক্ষাৎ করলে তিনি তাদের জানান তাদের ফেরত আনার ব্যাপারে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কচিকাঁচার একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন।বাংলাদেশ সফররত পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন।পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ বলেছেন পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালীদের নিরাপত্তা বিধানের প্রচেষ্টা নেয়ার জন্য কয়েকটি দেশে তিনি পত্র দিয়েছেন। তিনি পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালীদের স্বার্থ দেখাশুনার জন্য আন্তজার্তিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছেন।বিভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠিত মুক্তিফৌজ বাতিল করা হয়েছে। এসকল সংস্থা বা ব্যাক্তি কোন সম্পত্তি দখল করে থাকলে তাও বে আইনী দখল হিসেবে বিবেচিত হবে এ সকল সম্পত্তি তারা বেসামরিক প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করবেন।অর্থমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালীদের সংগ্রামের প্রেরনা দিয়েছিল। তিনি বলেন এ আন্দোলন শুরু ৪৮ সালে এবং ৫২ সালে তা পূর্ণতা পায়।আইন মন্ত্রী ডঃ কামাল হোসেন বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তজার্তিক আদালত প্রতিষ্ঠা হচ্ছে।

জাতীয় পুনর্গঠন সপ্তাহ শুরু হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর চূড়ান্ত। সূচী অনুযায়ী ২৯ তারিখ তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন। সফরে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিমান সাহায্য সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সাহায্য চাওয়া হবে।ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার ঢাকা সফরে আগামী ১৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স মাঠে ভাষণ দিবেন। ইন্দিরা গান্ধী তার বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে কিছু উপহার নিয়ে আসবেন। রাতে তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নিবেন এবং এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করবেন। ১৮ মার্চ তিনি নৌ বিহারে যাবেন। এবং পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করবেন। এদিন বিকেলে বঙ্গভবনে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হবে।দিনাজপুরের বিরলে মাইন বিস্ফোরণে ৬ শিশু নিহত।সুইজারল্যান্ড গুরুতর আহত ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার দায়িত্ব নিবে। ভারতের লখনউ থেকে পালিয়ে যাওয়া যুদ্ধবন্দীর মধ্যে একজন ছাড়া সবাইকে আটক করা হয়েছে। পলাতক একজন ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার।ন্যাপ নেতা মহিউদ্দিন নড়াইলে বলেছেন বাংলাদেশের দালাল রা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করছে। তারা যাতে দেশকে ধ্বংস করতে না পারে সে জন্য জনগনের প্রতি হুশিয়ার উচ্চারন করেন। তিনি ভারতের টাটা বিরলার মত পুঁজিবাদী শক্তি বিনিয়োগের নামে বাংলাদেশে আসার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেন। তিনি শেখ মুজিব ঘোষিত ১০০ বিঘা জমির সিলিং কমিয়ে ৫০ বিঘা করার আহবান জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সচিবালয়ে বিবদমান দু গ্রুপের বিরোধ মেটাতে গিয়ে তাদের উদ্দেশে বলেন আইন নিজের হাতে নেওয়ার সাথে যুক্ত লোকদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হবে এবং সে যাই হোক তাকে রেহাই দেয়া হবে না। সচিবালয়ে এক কর্মচারীর সাথে এক ক্যান্টিন কর্মচারীর মারামারির জের ধরে প্রধানমন্ত্রী দুপুরে লাঞ্চ করার যাওয়ার পথে তাদের মুখোমুখি হয়ে ঘটনা জানলে তাদের উদ্দেশে একথা বলেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন, আইন মন্ত্রী কামাল হোসেন সাথে ছিলেন।রেডিও মস্কো এবং তাস এর সাথে সাক্ষাৎ কারে প্রধানমন্ত্রী বলেন সকল শান্তিকামী দেশের সাথে বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে রাজী আছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর সকল বঞ্চিত মানুষের পক্ষে কথা বলে যাবে। পর রাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করে যাবে। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সোভিয়েত জনগন এবং সোভিয়েত সরকারের ভুমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন তাদের কাছে বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন তারা জাতিসংঘের ভিতরে এবং বাইরে বাংলাদেশের জন্য লড়াই করে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ব্যার্থ করে দিয়েছে। তিনি এ বছর বহজাতিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোভিয়েত সরকার ও জনগনের প্রতি শুভেচ্ছা জানান।

বিশ্ব বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় সহ একদল ভারতীয় বাঙ্গালী শিল্পী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় শিল্পীরা সেখানে গান পরিবেশন করেন। দলে ছিলেন ধীরেন মুখার্জি, সুমিত্রা মুখার্জি, শ্যামল মিত্রপ্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালীদের নিরাপত্তা বিধান ও উদ্ধারে বিশ্বব্যাপী তৎপরতা চালানোর জন্য পররাষ্ট্র দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন বিশ্ব এগিয়ে না আসলে এ চার লাখ বাঙ্গালীকে বাঁচানো সম্ভব নয়। একই সাথে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবাঙ্গালীদের সাথে পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালীদের বিনিময় প্রস্তাবও দিয়েছেন। তিনি বলেন নানা সুত্র থেকে খবর পাওয়া গেছে সেখানে ব্যাপক হারে বাঙ্গালী নির্যাতন হচ্ছে।এদিন পাকিস্তানে আটক বাঙ্গালীদের পরিবারের একটি দল সাক্ষাৎ করলে তিনি তাদের জানান তাদের ফেরত আনার ব্যাপারে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।কচিকাঁচার একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন। এ দলে ছিলেন আজকের ছড়াকার লুতফর রহমান রিটন। সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে প্রধানমন্ত্রী এ ছবি গুলি নিয়ে যাবেন এবং সোভিয়েত শিশুদের প্রদর্শন করার জন্য সে দেশের সরকারকে উপহার দিবেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

সরকার বিরোধী তীব্র আন্দোলনে সরকার রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। তিনি এদিন কুর্মিটোলা সেনানিবাসের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

বেলা ১২ টায় মুক্তি হলেও তিনি ষড়যন্ত্র মামলার আসামীদের মুক্তি পর্যন্ত জেলখানা ত্যাগ করেননি। বেগম মুজিব দুপুর একটায় ক্যান্টনমেন্টে দুপুরের খাবার নিয়ে যখন বাসা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখনি মুক্ত শেখ মুজিব বাসায় আচমকা প্রবেশ করেন। এ সময় শেখ মুজিবের সাথে ছিলেন তার আইনজীবী জুলমত আলী খান। বাসায় প্রবেশের পর বেগম মুজিব কড়া ভাষায় প্রশ্ন করেন তিনি মুক্তি নিয়ে এসেছেন কিনা।

শেখ মুজিব উত্তরে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানালে তিনি খুশী মনে আপ্যায়নের কাজে চলে যান। আগের দিন রাতে বেগম মুজিব জেলখানায় গেলে শেখ মুজিবকে ডাল রান্না করতে দেখে আসেন। তখনও তারা তার মুক্তির আভাষ পাননি। বাসায় আসার পর বাড়ীর বেলকনীতে দাড়িয়ে তিনি আগত জনতার উদ্দেশে অভিবাদন জানান। এক ফাকে তিনি বাড়ীর ছাদে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপ আলোচনা করেন। এ সময় তাদের সাথে ছিলেন সোহরাওয়ারদির জামাতা সুলেমান এবং মেয়ে আখতার সুলেমান। এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারী গোল টেবিল বৈঠক নির্ধারিত থাকলেও শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিতে অস্বীকৃতি জানানোতে গোলটেবিল বৈঠক পিছিয়ে যায়।এদিন আরও যারা মুক্তি পান তারা হলে মনি সিংহ, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মতিয়া চৌধুরী, হাতেম আলী খান, শুধাংশু দত্ত, মন্মথ দে, অমল সেন গুপ্ত, বিমল দত্ত, মনি কৃষ্ণ সেন, নগেন সরকার, জিতেন ঘোষ, রবি নিয়োগী, ফরিদপুরের শান্তি রঞ্জন সেন গুপ্ত, সন্তোষ বেনার্জি, ঢাকার আব্দুল হালিম, জামালপুরের খন্দকার আব্দুল মালেক, টাঙ্গাইলের আব্দুর রহমান সিদ্দিকি, লতিফ সিদ্দিকি, কুমিল্লার শিব নারায়ন দাস (বাংলাদেশ পতাকার ডিজাইনার) সিলেটের ন্যাপ ভাসানী নেতা আকমল হোসেন (পরে আবার গ্রেফতার)কেএম ওবায়দুর রহমান সহ ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামী।

মুক্তি উপলক্ষে ঢাকা শহর মিছিলের নগরীতে পরিনত হয়। কোন কোন মিছিলে ব্যান্ড পার্টির বাদ্য বাজানো হয়। দুপরের দিকে ধানমণ্ডির বাসায় আগমনের পর শেখ মুজিব একটি মিছিলে যোগ দেন। মিছিলটি শহীদ মিনার অভিমুখে রওয়ানা হয়। মিছিলটি ইডেন কলেজের কাছে এলে ছাত্রীরা তার উপর পুস্প বর্ষণ করে। মিছিলটি শহীদ মিনারে পৌছলে নার্স হোস্টেলের ছাদ থেকে শ্লোগান দেয়া হয়। শহীদ মিনারে তিনি সকল শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং মোনাজাত করেন। এরপর মিছিলটি তিন নেতার মাজারে গেলে তিনি সেখানেও শ্রদ্ধা নিবেদন এবং মোনাজাত করেন। এর পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান সেখানে তার মুক্তির জন্য অনশনরত ৫ ছাত্রের অনশন ভঙ্গ করান। সেখান থেকে তিনি আজিমপুর গোরস্থানে সার্জেন্ট জহুরুল হকের মাজারে মোনাজাত করেন এবং আন্দোলনে আহতদের দেখতে যান। এ সময়ে পল্টনে ২ লাখ লোক জমায়েত হয়। সেখানে তার যাওয়ার কথা থাকলেও শেখ মুজিব ক্লান্তি জনিত কারনে সেখানে যেতে পারেননি।

শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য কারামুক্ত পিপিপি সভাপতি জুলফিকার আলী ভূট্টো আগামীকাল ঢাকা আসছেন। মুক্তির পর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খান, জুলফিকার আলী ভূট্টো, এয়ার মার্শাল আসগর খান, বিচারপতি মুরশেদ টেলিফোনে শেখ মুজিবের সাথে কথা বলেন।রাত সাড়ে নয়টায় শেখ মুজিব ভাসানীর সাথে দেখা করেন। তাদের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা হয়। ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯"রেসকোর্সে ১০ লক্ষাধিক জনতার সমাবেশে শেখ মুজিব ঘোষণা করেন তিনি আইউব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেবেন। বৈঠকে তিনি পাকিস্তানের উভয় অংশের ন্যায়সঙ্গত দাবী তুলে ধরবেন। রেসকোর্সে তার সংবর্ধনা উপলক্ষে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সমাবেশে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন। সভা পরিচালনা করেন ডাকসু সভাপতি তোফায়েল আহমেদ। এ সভায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কয়েক আসামী উপস্থিত ছিলেন।

মঞ্চে শেখ মুজিবের পাশে আসন গ্রহন করেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী শামসুর রহমান, আলী রেজা, সুলতান উদ্দিন, খুরশিদ আলম ও সোহরাওয়ারদী কন্যা আখতার সুলেমান। শেখ মুজিব তার ভাষণে বলেন এখন তিনি আর প্যারিটি মেনে নেবেন না। তিনি বলেন পরোক্ষ নির্বাচন আর নয় এখন থেকে প্রত্তেক্ষ নির্বাচন চাই। এক ইউনিট থাকবে কিনা তার উপর তিনি গণভোট চান। তিনি বলেন প্রদেশ গুলোর স্বায়ত্তশাসনের উপর তিনি জোর দিবেন। সভায় তিনি বলেন তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পান না। তিনি বলেন এ মামলা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নহে ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র মামলা। মোনায়েম খান সম্পর্কে তিনি বলেন যে ব্যাক্তির নাম শুনলে এদেশের মানুষের আতঙ্কে ঘুম থেকে জেগে উঠে সে লোক এখনও কিভাবে গভর্নর থাকে। তিনি বলেন এ মোনেম খান ক্ষমতায় এসেই বলেছিলেন তিনি ক্ষমতায় থাকতে মুজিবকে জেলেই থাকতে হবে।

এত খুন নির্যাতনের পরও সে কিভাবে গভর্নর থাকে। শেখ মুজিব বলেন আমি জেল থেকে বেড়িয়ে এসেছি এবার আপনি বিদায় নেন। আইউবের উদ্দেশে তিনি বলেন তাকে আর এ প্রদেশে ফেরত পাঠাবেন না সেখানেই রেখেদিন। তার সম্পর্কে তিনি বলেন এ লোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক আব্দুল হাইকে ডেকে নিয়ে তাকে রবীন্দ্র সঙ্গিত লিখতে বলেছিলেন। তিনি বলেন হাই লিখলে তো আর সেটি রবীন্দ্র সঙ্গীত হয় না হয় হাই সঙ্গীত। তিনি বেতারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন তার সঙ্গীত প্রচার করতে হবে তিনি একজন বিশ্ব কবি। তিনি বলেন ভৌগোলিক কারনেই এক প্রদেশ আক্রান্ত হলে আরেক প্রদেশের সাহায্যের কোন সুযোগ নেই তাই ৬৫ এর যুদ্ধে বাঙ্গালীরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাহায্যে আসতে পারেনি। আর এজন্যই দরকার পূর্ব পাকিস্তানকে স্বয়ং সম্পূর্ণ করে তোলা। ৬৫ সালের অভিজ্ঞতার আলোকেই তিনি ৬৬ সালে লাহোরে ৬ দফা পেশ করেছিলেন। তখন তারা ৬ দফা গ্রাহ্য করেনি।

শেখ মুজিবুর রহমান বলেন যখন তাকে আগরতলা মামলায় জেলে প্রবেশ করানো হয় তখন তিনি এক মুঠো মাটি নিয়ে প্রার্থনা করেছিলেন তিনি যেন বাংলার মাটিতে আশ্রয় পান। তিনি বলেন বাংলার মাটিকে বাংলার মানুষকে আমি ভালবাসি। তারাও আমাকে ভালবাসে। তিনি বলেন কয়েকজন শিল্পপতির জন্য পাকিস্তান কায়েম হয়নি। ১২ কোটি মানুষের মুক্তির জন্য পাকিস্তান এসেছে কিন্তু জনগনের কোন উন্নয়ন হয়নি। তিনি আইউব সরকারের সকল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে বলেন হিটলারের পরেই আইউবের স্থান। তিনি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো প্রসঙ্গে বলেন কেন্দ্রীয় সরকার শুধু তিনটি বিষয় নিয়েই থাকবে বাকী সব থাকবে প্রাদেশিক সরকারের উপর। ১১ দফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন ১১ দফার প্রশ্নে কোন আপোষ নেই। ১১ দফার ভিতরেই তার ৬ দফা আছে। জগন্নাথ কলেজকে প্রাদেশিকীকরনের তিনি নিন্দা করেন।সভায় তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ১১ দফার প্রতি অবিচল সমর্থন দেয়ার আহবান জানান। তিনি বাংলায় পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত লেখার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান।সভায় জনগনের পক্ষ হতে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু পদবীতে ভূষিত করা হয়।সভায় যে সকল প্রস্তাব গ্রহন করা হয় তা হল ৩ মার্চের মধ্যে মন্ত্রীসভার পদত্যাগ, পরিষদ সদস্যদের পদত্যা্‌গ, সকল মৌলিক গণতন্ত্রীদের পদত্যাগ এবং সরকারের সকল খেতাব বর্জনের আহবান জানানো হয়।গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে শেখ মুজিবের সাথে পশ্চিম পাকিস্তান যাচ্ছেন তাজ উদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল, মুস্তাক আহমেদ, মিজানুর রহমান চৌধুরী, আব্দুল মোমেন, জহুর আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম চৌধুরী সহ ৯ জন।পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আজম খান এক বিবৃতিতে শেখ মুজিবের মুক্তিতে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।জনসভা শেষে জনতা বাড়ী ফেরার সময় জনতার উপর ঢাকা ক্লাবের সম্মুক্ষে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এতে তিন জন আহত হয়। পরে উত্তেজিত জনতা ঢাকা ক্লাব ভাংচুর করে। শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে গুলিবর্ষণের ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন।পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলী ভূট্টো ঢাকা পৌঁছে মওলানা ভাসানীর সাথে বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন তার দল আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ এর সাথে একযোগে কাজ করতে চায়। তিনি বলেন ভাসানী এবং মুজিবের মধ্যে মতপার্থক্য অবসান ঘটাতে তিনি চেষ্টা করে যাবেন। তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। পরে আবার রাতে তিনি শেখ মুজিবের সাথে ২য় দফা সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে ভূট্টো জানান তাদের মধ্যে সন্তোষ জনক আলোচনা হয়েছে। উভয়ে একই বিমানে পিণ্ডি যাবেন। সেখানেও তারা আলাপ আলোচনা করবেন।পিডিএম নেতা আতাউর রহমান খান, কম্যুনিস্ট পার্টি প্রধান মনি সিংহ, মুসলিম লীগ নেতা কাজী কাদের শেখ মুজিবের সাথে দেখা করেছেন।প্রেসিডেন্ট আইউব খান রাওয়ালপিন্ডিতে পূর্ব পাকিস্তান ও সিন্ধুর গভর্নরের অবস্থানের মেয়াদ বর্ধিত করেছেন। তুমুল আন্দোলনের মধ্যে এ দু গভর্নর রাওয়ালপিন্ডি আশ্রয় নেন।সাম্প্রতিক মুক্তিপ্রাপ্ত অনেককেই নিয়ে জনতা আজ শহরে আনন্দ মিছিল বের করেন এদের মধ্যে আছেন মতিয়া চৌধুরী এবং লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম। শেখ মুজিব বাদে অপরাপর নেতাদের আগামীকাল গন সংবর্ধনা দেয়া হবে।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

খুলনার পাইক গাছায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান নিক্সনের চীন সফরের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন এশিয়ার ভাগ্য এশিয়ার জনগনই নির্ধারণ করবে।

তিনি চিনে বসে এশিয়ার সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা না করার জন্য দু দেশের সরকার প্রধানের কাছে আহবান জানান। জনসভায় তিনি জানান এ পর্যন্ত ৪০টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন দেয়ার জন্য তিনি কয়েকটি দেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি জনগণকে জাতীয় পুনর্গঠনে এগিয়ে আসার আহবান জানান। তিনি বিকেলে হেলিকপ্টার যোগে এখানে আসেন। তিনি সেখানে একটি বাধ নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন করেন। পরে সেখানেই জনসভায় ভাষণ দেন।ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা তাস এবং সোভিয়েত রেডিওকে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি আসন্ন সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর সম্পর্কে তাদের কিছু প্রশ্নের উত্তর দেন।প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান খুলনার জনসভা শেষ করে টুঙ্গিপাড়া নিজ গ্রামের বাড়ীতে গমন করেন। ঢাকা থেকে আরেক হেলিকপ্টারে একই সময়ে তার দুই পুত্র ও দুই কন্যা এবং স্ত্রী টুঙ্গি পাড়া পৌঁছেন। প্রধানমন্ত্রীর এটি ২৫ মার্চ পরবর্তী প্রথম গ্রামের বাড়ী সফর। শেখ জামাল এ সফরে যাননি। এ ছাড়াও মন্ত্রী খন্দকার মস্তাক এবং শেখ আজিজ শেখ মুজিবের সাথে ছিলেন। বিগত ১৯ মে বাড়ীটি পাক হানাদার বাহিনী পুড়িয়ে দেয়ার পর একটি টিনের ঘর পুনঃ নির্মাণ করে প্রধানমন্ত্রীর পিতা মাতা সে বাড়ীতে বসবাস করতে থাকেন। সফরকালে বাড়ীতে তার এক ভগ্নিপতি ভাই নাসের এবং পিতা মাতা উপস্থিত ছিলেন। বীরাঙ্গনা পুনর্বাসনসরকার বীরাঙ্গনা পুনর্বাসনে ১০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছে।

এ লক্ষে প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ লক্ষে তিনি ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি বোর্ড গঠন করেছেন। বোর্ডে বিচারপতি কেএম সোবহান চেয়ারম্যান, আব্দুল আওয়াল নির্বাহী পরিচালক হয়েছেন। অপর সদস্যরা হলেন বদরুন্নেসা আহমেদ, নুরজাহান মুর্শিদ, সাজেদা চৌধুরী, মমতাজ বেগম, রাফিয়া আখতার, নীলিমা ইব্রাহীম, সুফিয়া কামাল, জাহানারা রাব্বি, মিসেস মুনির চৌধুরী,মিসেস জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, মোসফেকা মাহমুদ, বোর্ড তাদের চিকিৎসা, ঔষধ, পেশাগত শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করবেন। এ ছাড়া নিহত বুদ্ধিজীবীদের মা, বোন, স্ত্রীদের একই রুপ সাহায্য ও সুবিধাও দিবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদেশী কয়েকটি সংস্থা অর্থ সাহায্য দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছে তাদের একটি হল ইন্টারন্যাশনাল প্যারেন্টহুড ফেডারেশন। তারা তাদের অর্থ ইতিমধ্যেই ছাড় করেছে।

এ ছাড়াও সুইডেনের একটি সংস্থা এবং কতিপয় দেশের কাছেও সাহায্য চাওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচীতে আছে ৫০ টি সেবা সদন স্থাপন বৃত্তিমূলক শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন। বেক্তি পর্যায়ে কিছু বিদেশী বাংলাদেশে কাজ করার জন্যও এসেছেন। তারা কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে যোগাযোগও করেছেন। 

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

ভাষ্য গ্রহনে কেজি মোস্তফা, সংবাদ আকারে পরিবর্তিত করা হয়েছে।

একই ভাষ্য আরও সংক্ষেপে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বর্ণিত আছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য এক সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন ভাষা আন্দোলনের শুরু ১৯৪৭ সালে এর বিকাশ ৬১-৬৯ এবং পরিনতি ১৯৭১। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ভারত বিভাগের ঘোষণার সাথে সাথে শেখ মুজিব কলকাতার সিরাজুদ্দউলা হলে ছাত্র নেতাদের এক কনভেনশন ডেকেছিলেন। ৩রা জুনের পর বাংলা ভাগের পর শেখ মুজিব পাকিস্তানের কাঠামোয় বাঙ্গালির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন রাজধানী সহ সব কিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে স্থাপন করা হচ্ছিল। জনগন তখন তত সজাগ ছিল না। সে ছাত্র সমাবেশে শেখ মুজিব আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন কিছু একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বাংলাদেশকে কলোনি করা হবে। বাংলার মানুষের উপর আঘাত করা হবে। এ স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা নয়। তিনি বলেছিলেন আমাদের নতুন করে আবার স্বাধীনতার সংগ্রাম করতে হবে। কেজি মোস্তফা সে সভায় উপস্থিত ছিলেন। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে লেখাপড়া বাদ দিয়ে শেখ মুজিব আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলন করতে গিয়ে ১১ মার্চ সচিবালয়ের দক্ষিন গেটে তিনি গ্রেফতার হলেন। ১৫ মার্চ মুক্তি পেয়ে ১৬ মার্চ থেকে আবারো আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনের জন্যই বিরোধী দলহীন এ প্রদেশে তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। খবর আসে জিন্নাহ ২১ বা ২২ তারিখে ঢাকা আসবেন এর মধ্যে তিনি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। যখন গণপরিষদে উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষার প্রস্তাব করা হয় তখন একমাত্র ধীরেন্দ্র নাথ বাবু (কংগ্রেস) ছাড়া কেউ প্রতিবাদ করেনি। ধীরেন বাবু বাংলাকে ৩য় রাষ্ট্রভাষা করার সংশোধনী প্রস্তাব আনলে তা খারিজ করে দেয়া হয়। তিনি বলেন ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে জিন্নাহ র ভাষণ দেয়ার কথা ছিল সে উপলক্ষে তিনি ছাত্র নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেছিলেন। শেখ মুজিব বলেন আমি সেই বৈঠক বর্জন করেছিলাম। তিনি বলেন পার্টিশনের আগে একমাত্র বাংলায় মুসলিম লীগের শাসন ছিল। কিন্তু ক্যাবিনেট মিশনের সাথে আলোচনায় তিনি কোন বাঙ্গালী নেতা রাখেননি। তিনি কঠোর বাঙালী বিদ্বেষী ছিলেন। তিনি বলেন ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষে বাংলায় ৩০ লাখ মানুষ মরলেও জিন্নাহ বাংলায় আসেন নি। তিনি পূর্ব বাংলাকে বোম্বে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাবসায়ীদের বাজার বানাতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন ৪৮ সালের আন্দোলনের পরিনতি ছিল ৫২ এর আন্দোলন। শেখ মুজিব বলেন তিনি তখন জেলে। তিনি বলেন জেলখানা থেকে আমি সিপাইদের মাধ্যমে নির্দেশনা দিতাম। তিনি বলেন আমি ৫০ সালের ডিসেম্বরে জেলে অসুস্থ হয়ে নিরাপত্তা বন্দী হিসেবে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন। সেখানে তিনি জানুয়ারী মাস পর্যন্ত থাকেন। তিনি বলেন সে সময় নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আবারো পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলেন সে সময় পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে তিনি ছাত্রনেতাদের সাথে সেখানে কয়েকদফা বৈঠক করেন। আইবি অফিসাররাই ছাত্রনেতাদের বাড়ী থেকে ধরে আনত এবং রাত একটার পর বৈঠক চলত। বৈঠক কোন কোন সময়ে কেবিনের পিছনের বাথরুমেও হত। নেতাদের সকল দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পর তিনি ১৬ ফেব্রুয়ারী থেকে অনশন করবেন বলে জানান। নেতারা তাকে জানিয়েছিলেন আন্দোলন শুরু হবে ২১ ফেব্রুয়ারী থেকে। আন্দোলনের খবর হাসপাতাল থেকে ফাস হয়ে গেলে শেখ মুজিবকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন জেলে তখন ন্যাপের মহিউদ্দিন ছিল শেখ মুজিবের অনুরোধে সেও অনশনে যোগ দেয়। সরকার পরিস্থিতি আচ করে শেখ মুজিবকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করে। যথারিতি ২১ ফেব্রুয়ারী আন্দোলন শুরু হয়। তিনি বলেন ৪৮ সালে কেউ মারা যায়নি বলে ৪৮ সালের বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই কিন্তু সে সময় প্রচুর আহত হয়েছিল কোন হাসপাতালে জায়গা হচ্ছিল না। শুধু ঢাকায় নয় ৪৮ সালে যশোর চট্টগ্রাম রাজশাহী ফরিদপুরেও জনতা রক্ত দিয়েছিল। 

শহীদ মিনারে শেখ মুজিব
সকাল ৮ টায় মন্ত্রীসভার সদস্যদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি আজিমপুর কবরস্থান থেকে নগ্ন পদে শোভাযাত্রা সহকারে শহীদ মিনারে আসেন। পরে সেখানে উপস্থিত জনগনের উদ্দেশে শেখ মুজিব বলেন স্বাধীন বাংলাদেশে শোষণ মুক্ত সমাজ বেবস্থা কায়েম করতে না পারলে এত মানুষের আত্মত্যাগ অর্থহীন হয়ে পড়বে। দেশে গুণ্ডামির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন গুন্ডা পাণ্ডাদের জন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। তিনি বলেন এসকল গুণ্ডাদের কাছ  থেকে অস্র ছিনিয়ে আনতে হবে। তিনি বলেন ষড়যন্ত্রকারীরা এখনও খেলছে। তিনি বলেন ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার জন্যই ছিল না এ আন্দোলনেই স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। শেখ মুজিবের সাথে শহীদমিনারে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ শিল্প মন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, পানিসম্পদ মন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক আহমেদ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, মতিউর রহমান, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আব্দুল মোমেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ। প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে শহীদানের আত্তার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করেন।পরে শেখ মুজিব শহীদ মিনারে বরকতের বোনের সাথে কিছুক্ষন কথা বলেন।শহীদ মিনারের পাদদেশে শেখ মুজিবের বক্তৃতা দেয়ার জন্য মাইকের ব্যাবস্থা ছিল না। কন্ট্রোল রুমের মাইক ও সেখানে সংযোগ দেয়ার ব্যাবস্থা করা যায়নি ফলে শেখ মুজিব মাইক ছাড়াই ভাষণ দেন। 

বাহাত্তরের শহীদ দিবসে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীবৃন্দ 
সফররত ভারতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ত এবং বুদ্ধিজীবীরা আজ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সত্যজিৎ রায়, শ্রী মনোজ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, শ্যামল মিত্র, দক্ষিনা রঞ্জন বসু, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়, কাজী সব্যসাচী কাজী অনিরুদ্ধ। শহীদ মিনারে আয়োজন করা একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শ্যামল মিত্র গান পরিবেশন করেন।সমাবেশ শেষে সেখানে বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায় সহ আরও কয়েকজন ভারতীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ত উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সত্যজিৎ রায় বক্তৃতা করেন।

একুশ উদযাপন 
মধ্যরাত্রির পর থেকেই হাজারো দেশবাসী শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য আজিমপুর কবরস্থানে গমন করে তাদের সকলের হাতেই ছিল ফুল বা ফুলের স্তবক। সেখান থেকে তার নগ্ন পদযাত্রায় শহীদ মিনারে এসে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। এদের অনেকেই দেশাত্মবোধক গান গেয়ে সেখানে গমন করেন। প্রথম প্রহরে প্রেসিডেন্ট শহীদ কবর এবং মিনারে শ্রদ্ধা গাপন শেষে তিন নেতার মাজারে গিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।

সকল ক্ষেত্রেই তিনি ফাতেহা পাঠ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং মন্ত্রীসভার সদস্যরা খুব সকালে শহীদানের কবর জিয়ারত করেন ও শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী আজিমপুর থেকে শোভাযাত্রা সহকারে শহীদ মিনারে যান।যুদ্ধাহত চিকিৎসাধীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্র্যাচে করে ও স্ট্রেচারে করে শহীদ মিনারে এসেছিল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে। তারা এ অবস্থায় ছাত্রলীগের পল্টনের সভায়ও যোগ দিয়েছিলেন।বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী দেশ সমুহের মিশন প্রধান গন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন পৃথক পৃথক ভাবে শহীদমিনারে শপথ গ্রহন করে।ভারতের শিল্পীরা প্রেসক্লাবে সঙ্গীতানুষ্ঠানে গান ও কবিতা আবৃতি পরিবেশন করেন।বাংলাদেশ বাহিনী প্রধান জেনারেল ওসমানী শহীদমিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এসময় তার সাথে ছিলেন তার এডিসি শেখ কামাল।

ছাত্রলীগের জনসভা 
শহীদ দিবস ও জাতীয় শহীদ দিবস উপলক্ষে সপ্তাহ ব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিনে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ সমাবেশ করে। সমাবেশে ৪ ছাত্রনেতা বক্তব্য প্রদান করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতা পূর্ব ১১ দফার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। ছাত্র নেতৃবৃন্দ বলেন দেশের শত্রু দালালদের রক্ষার জন্য একটি মহল উঠে পরে লেগেছে। এদের রেহাই দেয়া হলে বা আইনের মার প্যাঁচে এরা মুক্ত হলেও দেশ বাসী এদের ক্ষমা করবে না। দালাল মুক্ত করার জন্য ছাত্রলীগ শুদ্ধি অভিযান চালাবে। সভায় আসম রব বলেন আগামীর আন্দোলন হবে সমাজতন্ত্র কায়েমের সংগ্রাম। তিনি বলেন স্বাধীনতার স্বাদ পেতে হলে দেশে শোষণ হিন সমাজ বেবস্থা বা সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। আর এ ধরনের সমাজতন্ত্রই মুজিববাদ। তিনি একাধিক বাড়িওয়ালাদের হুশিয়ার করে দিয়ে বলেন কোন নাগরিক কে একাধিক বাড়ী রাখতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন শত্রু সম্পত্তির(পাকিস্তানীদের সম্পত্তি)বাড়িঘরগুলো স্কুল কলেজ হাসপাতালের জন্য ব্যাবহার করতে হবে। তিনি বলেন সারা দেশে অবাধ লুটপাটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলে এদের আমরা নির্মূল করতে পারি।

নুরে আলম সিদ্দিকি বলেন আমরা আশা করি বঙ্গবন্ধু ভুল করবেন না। তিনি যেন মোসাহেব পারমিট শিকারিদের সুযোগ না দেন। তিনি দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা বেবস্থা চালুর সুপারিশ করেন। তিনি মুজিব বাদ ব্যাখ্যা করে বলেন গনতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা বহাল রেখে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই মুজিব বাদ।

শাহজাহান সিরাজ বলেন আমরা নতুন করে কোন দাবী জানাবো না। ২২ বছরে যত দাবী জানিয়েছি আমাদের বিপ্লবী সরকার তা মেনে নিবেন বলে আমরা আশা করি। তিনি বলেন দেশে বাংলা টাইপ রাইটারের অভাবের কারনে সর্বস্তরে বাংলা চালু করা যাচ্ছে না এমন ধারনার প্রতিবাদ করেন। তিনি সকল সাইন বোর্ড থেকে ইংরেজি মুছে ফেলার আহবান জানান।আব্দুল কুদ্দুস মাখন বলেন ভাষা আন্দোলন ছিল জাতি হিসেবে বাঙ্গালী জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম। সে আন্দোলন ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা মাত্র।সমাবেশ শেষে সেখানে বিশাল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ রায় সহ আরও কয়েকজন ভারতীয় সাংস্কৃতিক বেক্তিত্ত উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সত্যজিৎ রায় বক্তৃতা করেন।

তাজউদ্দিন আহমেদ কাপাসিয়ায় এক বিরাট জনসভায় বলেন দেশ পুনর্গঠনের জন্য শান্তি ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন সমাজ থেকে দুষ্কৃতিকারী ও সমাজবিরোধীদের নির্মূল করার জন্য তিনি যুব সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান। শিল্প মন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম বিআইডিসি স্রমিক ইউনিয়নের শহীদ দিবসের অনুষ্ঠানে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করার জন্য শ্রমিকদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।কমনওয়েলথ প্রধান আর্নল্ড স্মিথের সাথে বৈঠকের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেছেন বাংলাদেশ শীঘ্রই কমনওয়েলথ সদস্যপদের জন্য আবেদন করবে। স্মিথ বলেন বাংলাদেশ আবেদন করলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সদস্যপদ দেয়া হবে।বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মিশন বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হতে পারে। সরকার বলেছে আমরা যদি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে না পারি তবে তাদের কেন এখানে মিশন রাখতে দিব।সরকার পরিতেক্ত সম্পত্তি আদেশ জারী করেছেন। এই আইনের ফলে ২৫ মার্চের পর যারা দেশের অন্যত্র বা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার দরুন সে সময়ের সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল সে সকল সম্পত্তি ফেরত দেয়া হবে।শীর্ষ দালাল খাজা খয়ের এবং ওবায়দুল্লাহ মজুমদার গ্রেফতার হয়েছেন।

খয়ের ঢাকা শহর থেকেই গ্রেফতার হয়েছেন। পাকিস্তান ন্যাপ প্রধান ওয়ালী খান বলেছেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের বিষয়টি তার দেশের জাতীয় পরিষদ ঠিক করবে এ ব্যাপারে ভূট্টোর কোন ক্ষমতা নেই।ধানমণ্ডির ন্যাশনাল মিলিশিয়া মোহাম্মদপুর মিরপুর থেকে ৪৮ টি চোরাই গাড়ী উদ্ধার করেছে।কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থানার আকবর ডাইলে বোমা বিস্ফোরণে ১৪ জন নিহত ৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।ফেনীর মুহুরি নদীর উপর মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত রেল ব্রিজটি মেরামত শেষে চালু করা হয়েছে। ফলে ঢাকা চট্টগ্রাম রেলপথে একটি প্রতিবন্ধকতা অপসারিত হল।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

শেখ মুজিবুর রহমান সকালে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে নোয়াখালীর রামগতি সফর শুরু করেছেন। সেখান থেকে তিনি ভোলা যাবেন। তিনি রামগতিতে কৃষি বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন। তিনি সেখানে জনগনের স্বেচ্ছাশ্রমে একটি উপকূলীয় বাধ নির্মাণ প্রকল্প উদ্বোধন করেন। এ বাধ নির্মাণে কয়েক হাজার সেচ্ছাসেবী কাজ করছে। পানি সম্পদ মন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক আহমেদ ও রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ এ সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ছিলেন। 

রামগতির মেঘনার চরে এক জনসভায় তিনি বলেন বাংলাদেশে ১ ইঞ্চি জমিও অনাবাদী রাখা যাবে না। তিনি বলেন এ সরকার জনগনের সরকার, সাধারন মানুষের সরকার। তিনি বলেন আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তূলতে হবে যে সমাজে এ কৃষকরা এ শ্রমিকরা এ ক্ষুধার্ত জনগন আবার হাসতে পারবে। তিনি বলেন জনগনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যার্থ হলে দেশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে। কাজেই স্বাধীনতা সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি মুলত সংগ্রাম কেবল শুরু হয়েছে। তিনি বলেন এবারের সংগ্রাম সোনারবাংলা গড়ে তোলার সংগ্রাম। তিনি বলেন আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। এর বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন কারো কাছে আলাদিনের চেরাগ নেই।

রাতারাতি এসব সমস্যা সমাধান কারো পক্ষে সম্ভব নয়। নিষ্ঠার সাথে কঠোর পরিশ্রম করে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। তিনি জনগনের কাছে জানতে চান রাস্তা বাধ সেতু নির্মাণে তারা স্বেচ্ছাশ্রম দিতে রাজী কিনা জনতা হা সূচক জবাব দেয়। তিনি বলেন দুষ্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে। তিনি বলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা সকলেই আমার কাছে অস্র সমর্পণ করেছে কিন্তু কিছু দুষ্কৃতিকারী এবং পাকিস্তানী দালালরা তাদের কাছে এখনো অস্র রেখে দিয়েছে। এসকল দালালদের কাছ থেকে অস্র ছিনিয়ে নিয়ে তা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করার জন্য তিনি জনগনের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন আমি আঠারো থেকে বিশ ঘণ্টা কাজ করি। তিনি সকলকে আরও পরিশ্রম করার আহবান জানান। তিনি বলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভূট্টো বাঙ্গালীদের ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করেছেন তাই তিনি সেখানকার বাঙ্গালীদের নিয়ে খুব উৎকণ্ঠিত। 

মুজিবুর রহমান ভোলার শান্তির হাটে এক জনসমাবেশে বলেছেন পরিবার প্রতি কারো একশত বিঘার বেশী জমি থাকবে না প্রয়োজনে এ সিলিং আরও কমানো হতে পারে। ফলে বাড়তি যে জমি পাওয়া যাবে তা সরকারের খাস খতিয়ানে এনে ভূমিহীন গরীবদের বন্দোবস্ত দেয়া হবে।বিকেলে তিনি ভোলার দৌলত খানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন।উভয় সফরে তিনি প্রকাশ করে এদেশে কারো একশ বিঘার বেশী জমি রাখতে দেয়া হবে না। 

এদিনের অন্যান্য খবর
সপ্তাহ ব্যাপী একুশের অনুষ্ঠানে আজ বাংলা একাডেমীতে ছিল মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কম্যান্ডারদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ও আলোচনা। এ আলোচনা এক্তি মহামূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত। অনেকের ভাষণ পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিল পত্রে সন্নিবেশিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে সকল সেক্টর কমান্ডার উপস্থিত ছিলেন। ভারতের প্রখ্যাত গায়ক শ্যামল মিত্র, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জনাব দক্ষিনা রায়, অঞ্জন ঘোষ, সাহিত্যিক অমল মুখার্জি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকা এসেছেন। ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কলকাতা থেকে শিল্পী সুচিত্রা মিত্র, কবি কাজী নজরুলের পুত্র সব্যসাচী ইসলাম, অনিরুদ্ধ ইসলাম এবং মিসেস অনিরুদ্ধ ঢাকায় এসেছেন। কলকাতা আশুতোষ কলেজের একদল ছাত্র এসেছেন ভাষা শহীদদের প্রতি সন্মান জানাতে। মতিঝিলের একটি পেট্রলপাম্পের কাছে সশস্র দুষ্কৃতিকারীদের সাথে পুলিশের গুলি বিনিময় হয়। এ সময় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে।বাংলাদেশ টেলিভিশন সকাল ৫ টা থেকে একুশের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে।মিরপুরে বিহারী  আস্তানায় শেষ তল্লাশী মিরপুরের ১১ ও ১২ নং সেকশনে অস্ত্র উদ্ধারের জন্য শেষ তল্লাশী করা হয়েছে। পাশাপাশি ডোবা নালায় ও তল্লাশি করা হয়েছে। এ অভিযানেও অনেক সন্দেহভাজন আসামী ধরা হয়। যাদের আটক করা হয় তাদের পরিবারদের পাঠানো হয় রুপগঞ্জের মুড়াপাড়া ক্যাম্পে। সেখানে তাদের রেডক্রসের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। মুড়া পাড়া কলেজে বিশাল অস্থায়ী ক্যাম্প করা হয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাদেশে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ভ্যালেন্টাইন পোপভ আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন।

আলোচনায় ২৯ ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফর নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ফরাসী সাহিত্যিক রেবেকা শিলা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন।ভারতের নব নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সুবিমল দত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেছেন।

ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ আজ তাদের একুশে উপলক্ষে প্রকাশ করা লিফলেট প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবকে দেখান। লিফলেটের শিরোনাম ছিল পড় বাংলায় লিখ বাংলায়। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক সমাপ্ত হয়েছে। এতে যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়।

১) আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করা হবে
২) ২৫ ফেব্রুয়ারী থেকে পুনর্গঠন সপ্তাহ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
৩) গুপ্ত হত্যা লুটতরাজ অগ্নিসংযোগ এবং অন্যান্য গুরুতর অপরাধের জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়
৪) স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানানো হয়
৫) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থনকারী দেশ সমুহের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়
৬) পাক বাহিনীর দালালদের কঠোর শাস্তির দাবী জানানো হয়
৭) স্বাধীনতার ইতিহাস মুদ্রনের কার্যক্রম শুরু করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়
৮) স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক যাদুঘর প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
৯) মুজিবনগরে স্মৃতিসৌধ এবং পার্ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়
১০) রেসকোর্স ময়দানের নাম সোহরাওয়ারদি উদ্যান সচিবালয়ের নাম মুজিব নগর এবং ২য় রাজধানীর নাম শেরে বাংলানগর রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ ছাড়া কমিটি স্থানীয় কমিটিগুলিকে নিজ নিজ এলাকার ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দিতে বলেছে। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেছেন আমরা কারো কাছ থেকে স্বীকৃতি ভিক্ষা চাই না। বাংলাদেশকে স্বীকার করে নেয়ার দায় দায়িত্ব সকল দেশগুলির তাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। তিনি বলেন ৪২টি দেশের স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি বাংলাদেশের প্রতিবেশী সকল দেশের স্বীকৃতি আমরা পেয়ে গেছি। তিনি বলেন চীনের সাথে আওয়ামী লীগের সব সময়ই ভাল সম্পর্ক ছিল।

আওয়ামী লীগ চীনা প্রধানমন্ত্রী চউ এন লাইকে তাদের শাসনামলেই সফরের আমন্ত্রন জানিয়েছিল এবং তিনি ঢাকায় আসলে আওয়ামী লীগ তাকে বিপুল সংবর্ধনা দিয়েছিল। তিনি বলেন চীনা জনগনের সাথেও তাদের বিরোধ নেই তাই চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে পারে। 

অমর একুশে উপলক্ষে বই মেলায় (৮ ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু) কৃত্তিবাস ওঝার আমি মুজিব বলছি এবং হেদায়েত হোসেন মোরশেদের স্বাধীনতার সংগ্রাম ঢাকায় গেরিলা অপারেশন বই প্রকাশ করে নওরোজ কিতাবিস্তান। শরণার্থীদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার আইন জারী হয়েছে।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন কাউকেই গন পরিবহণে বিনা ভাড়ায় চড়তে দেয়া হবে না।

কেউ এ নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তি দেয়া হবে। আজ সচিবালয়ে বাস কর্মচারীদের সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ের কাছে আসা শ্রমিকদের উদ্দেশে ভাষণও দেন। পরে শ্রমিকরা দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়। অস্ট্রেলিয়ার এমপি কেই বিজিল এবং ভারতের হিম্মত পত্রিকার সম্পাদক আরএম লালা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। গতকাল পুলিশ অস্র সহ ১৮ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা গ্রেফতার করে। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি সৈয়দ আহসান আলী দেশ থেকে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যাবস্থা তুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ছাত্রলীগের ৪ নেতা এবং ছাত্র ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক দৈনিক বাংলার সাথে সাক্ষাৎকারে মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের প্রস্তাব করেছিলেন। 

ভাষার মাস শুরুতে ছাত্র ইউনিয়ন সকল গাড়ীর নম্বর প্লেট বাংলায় করার দাবীতে গাড়ীতে নম্বর প্লেটে কালি দ্বারা মুছে দিচ্ছে। মওলানা ভাসানী যুবলীগ নামে সংগঠন গড়ে তুলছেন এমন খবরের প্রতিবাদ করছেন যুবলীগ সভাপতি খোন্দকার মঞ্জুরে মওলা। 

নোটঃ
১) সারা দেশে অনেক মুক্তিযোদ্ধারা বাস ভাড়া দেন না এবং এ নিয়ে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে এবং সম্প্রতি কুমিল্লায় এক বাস কর্মচারীকে মুক্তিযোদ্ধারা পিটিয়ে মারার জের ধরে ধর্মঘট ডাকার পর সালিশে শেখ মুজিব কথা বলেন। 
২) অস্র সহ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ধরা পরলেও মিডিয়ায় তাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা আখ্যায়িত করা হয়। 
৩) তখন আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা হয়নি।

নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী 
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিউইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধকার সিএল সুলবালজারের সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন ভারতের সাথে ভাল সম্পর্ক ছাড়া শক্তিশালী পাকিস্তান সম্ভব নয়। তিনি আজ মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যকে অমূলক ও বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করে এ কথা বলেন। রিপোর্টে বলা হয়েছিল ভারত পশ্চিম পাকিস্তানকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা ছিল এ পরিকল্পনায় ছিল সেনাবাহিনী একেবারে ধ্বংস করা এবং পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর দখল করা। গান্ধী বলেন আমরা স্বাধীন এবং শক্তিশালী পাকিস্তানই দেখতে চাই। আমরা দুর্বল পাকিস্তান দেখতে চাইনা। আমাদের নীতি ছিল শুধু পশ্চিম সেক্টরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কোন ভুমি অধিকারের কোন ইচ্ছা ছিল না।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ভারতীয় মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্ত এর কপি আছে এমন দাবীর প্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধী বলেন মন্ত্রিসভায় এমন সিদ্ধান্তই হয়নি। তিনি বলেন বাংলাদেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এ প্রত্যাহার ১৬ ডিসেম্বর থেকেই শুরু হয়। ডিসেম্বরেই আমরা আমাদের অর্ধেক সৈন্য ফেরত এনেছিলাম। যুদ্ধবন্দীর ব্যাপারে পাকিস্তান এখনও আমাদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়নি।

আলোচনা শুরু হলেই কেবল বন্দী মুক্তি প্রক্রিয়া শুরু হবে। ভারতের সীমান্ত আগের মতই থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে গান্ধী বলেন কিছু রদবদল হওয়া উচিত তবে তা বড় ধরনের কিছু না।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ বলেছেন, জাপানী প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত মুজিব ভূট্টো শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তাব সম্পর্কে বাংলাদেশ কোন কিছু অবহিত নয়। তবে পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত এরূপ বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে তিনি জানান। সামাদ আজাদ ব্রিটিশ সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে মিলিত হন। তিনি প্রতিনিধিদলকে বলেন বাংলাদেশ স্বাধীন নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করবে।

পূর্ব জার্মানির রাষ্ট্রদূত লোথের ওয়েঞ্জেল প্রেসিডেন্ট আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছে তার পরিচয় পত্র দাখিল করেছেন। পরিচয় পত্র দাখিলের পর উভয়ের মধ্যে আলোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ৫ সদস্য বিশিষ্ট সোভিয়েত মৈত্রী দল আজ বাংলাদেশ সফরে আসেন বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী তোফায়েল আহমেদ এবং কবি সুফিয়া কামাল। 

বেগম নাফিসা কবির বাংলা একাডেমীর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন বুদ্ধিজীবী হত্যার পিছনে শুধু দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীই নয় বিদেশী শক্তির হাত আছে। তিনি বলেন সরকার বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ব্যাপারে গঠনমূলক কাজের কিছুই করেননি। তিনি বলেন জহির রায়হান যে সব তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। 

৭১ এ পাকবাহিনীর দোসর ৫৪ জন দালালের সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। এরা হলেন জামাতের মওলানা রহিম, কুমিল্লার কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ও প্রাদেশিক ডেপুটি স্পীকার এটিএম মতিন, পিডিপির জুলমত আলী খান, নারায়নগঞ্জের শহিদুল্লাহ খান, জামাতের এমএনএ জবান উদ্দিন, কাইউম মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট গাইবান্ধার সাইয়েদুর রহমান, পাবনার কনভেনশন লীগের এবং ডেপুটি স্পিকার বিহারী আসগর জায়েদি, কাউন্সিল মুসলিম লীগের আব্দুস সাত্তার খান সহ ৫৪ জনের সম্পত্তি ক্রোক করা হয়েছে। এদের সকলকে ২১ ফেব্রুয়ারী নিজ নিজ এলাকার উপযুক্ত আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আদালতে হাজির হওয়ার অন্য তালিকায় আছেন ৭১ এর মন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন সাবেক এমপিএ, মন্ত্রী একেএম ইউসুফ জামাত, এমএ মতিন কনভেনশন মুসলিম লীগ, জামাতের মওলানা আব্দুস সোবহান, আখতারউদ্দিন, আফিল উদ্দিন সহ অনেকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কার্যক্রম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বুলগেরিয়ান রেডিও ও টেলিভিশন এর এক সাংবাদিকের কাছে সাক্ষাতকারে বলেছেন জাতীয় উন্নয়নের প্রধান শর্ত হল জনগনের ঐক্য। তিনি বলেন আমি মনে করি এ ঐক্য হবে সমাজতন্ত্র গনতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতায়। তিনি বলেন বাংলাদেশ দক্ষিন পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকার সকল দেশের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তিনি সোভিয়েত সরকারের প্রশংসা করে বলেন তারা সমাজতান্ত্রিক দেশ তাদের দেশের জনগন বাংলাদেশের অকৃত্তিম বন্ধু। বুলগেরিয়াও সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বাংলাদেশের শুভাকাঙ্ক্ষী দেশ। আমরা তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে চাই। সাম্প্রতিক ভারত সফর সম্পর্কে তিনি বলেন ভারতের নীতির সাথে বাংলাদেশের নীতির মিল আছে। আমরা দু দেশ পৃথিবীর বঞ্চিত মানুষের বিষয়ে অভিন্ন সিদ্ধান্ত নিব।

তিনি ৯ মাসে পাক বর্বরতার কাহিনী তুলে ধরেন। তিনি বলেন বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে সোভিয়েত স্বীকৃতি খুব কাজে লাগবে। তিনি বলেন আমি শীঘ্রই সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করব। এ সফর বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সফরেই তাদের সহযোগিতার বিষয় সমুহ চূড়ান্ত হবে।প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্তে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সভা বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত সাড়ে চার ঘণ্টা যাবত চলে। বৈঠকে দেশের সকল শহীদানের প্রতি শ্রদ্ধা শোক প্রকাশ ও দোয়া চাওয়া হয়। এছাড়াও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠক পরদিন বিকেল পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট খলিলুর রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করে তার কাছে তার একটি ফটো এ্যালবাম বুঝিয়ে দেন। ২৫ মার্চ বা পরবর্তী কোন সময়ে তার বাসভবন থেকে এ্যালবামটি পাক বাহিনী নিয়ে গিয়েছিল। খলিলুর রহমান বিমানবন্দরের কাছে এলবামটি খুজে পান। 

জাতিসংঘ মহাসচিব কুর্ট ওয়ালড হেইম এর বিবৃতি জাতিসংঘ মহাসচিব কুর্ট ওয়ালড হেইম জাতিসংঘে বলেছেন বাংলাদেশে পুনর্গঠনে ৪১১ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। দেশে শরণার্থীরা আসার পর দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। দেশে এখন দু লাখ টন খাদ্য মজুত আছে। তিনি বলেন গত মৌসুমে ফসলহানী হওয়ায় সাড়ে তিন লাখ টন খাদ্য মজুদ কম হয়েছে। মজুদ খাদ্য এর ২০ ভাগ খাদ্য খাওয়ার উপযোগী নয়।

তিনি বলেন জাতিসংঘের ভাড়া করা নৌযানে প্রতি মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টন খাদ্য শস্য দেশের অভ্যন্তরে যাচ্ছে। ৪০০ ট্রাক খাদ্য পরিবহনে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন এ কাজে জাতিসংঘের মূলধন ফুরিয়ে যাচ্ছে। তিনি বাংলাদেশের পুনর্গঠনে জাতিসংঘের মাধ্যমে সাহায্য করার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলির প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

গত সপ্তাহে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ পুলিশ তৎপরতা জোরদার করা হয়। পুলিশ এদিন বেশ কিছু অস্র উদ্ধার করে। তারা ৫ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা গ্রেফতার করে।

ঢাকার থানা এবং ফাঁড়ি গুলোতে পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। পুলিশকে স্বয়ংক্রিয় অস্র দেয়া হয়েছে। জাপানের ৩ সদস্য বিশিষ্ট শুভেচ্ছা মিশন দলের ঢাকা আগমন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সাতো জাপানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভূট্টোর মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন।বাংলাদেশে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদুত ও ভারতের রাষ্ট্রদূতের পরিচয় পত্র পেশ।

পিলখানায় সাবেক ইপিআর ও কতক গণবাহিনীর সদস্যদের বিদ্রোহ। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিদ্রোহ দমন।ভৈরবে সাইদুল বাহিনী জিল্লুর রহমানের কাছে অস্র সমর্পণ করেছেন।সোভিয়েত বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের বন্যা নিয়ন্ত্রন মন্ত্রী মোস্তাকের সাথে সাক্ষাৎ।ছাত্রলীগের একুশের অনুষ্ঠানমালার প্রথম দিন।

হাসপাতাল থেকে এসে আসম রব ও নূরে আলম সিদ্দিকির অনুষ্ঠানে যোগদান। পিলখানায় শেখ মুজিব  পিলখানায় বিদ্রোহ দমন করতে সেখানকার উপস্থিত মিলিশিয়া বাহিনীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন লুটতরাজকে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।

এ সকল দুষ্কৃতিকারীরা নিরীহ মানুষের সম্পত্তি লুট করেছে তাদের কঠোর সাজা দেয়া হবে। তিনি মিলিশিয়াদের এ সকল দুষ্কৃতিকারীদের উপর দৃষ্টি রাখার আহবান জানান।

তিনি মিলিশিয়াদের উস্কানিদাতা ও ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে সজাগ থাকার আহবান জানান। নোটঃ সাবেক ইপিআর বাহিনী নতুন গঠিত মিলিশিয়ায় যোগ দিবে না বলে বিদ্রোহ করেছিল। তাদের দাবী ইপিআর নতুন নামে বহাল রাখা হোক।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন কারী গনবাহিনীর(সকল) সদস্যদের বীরত্ব এর জন্য চারটি খেতাব নির্ধারণ করেছেন। 

খুলনায় ট্রানজিট ক্যাম্পে দেশে প্রত্যাগত শরণার্থীদের মধ্যে বসন্তের প্রকোপে ৭০ জন শরণার্থী মারা গিয়েছে। এরা সকলেই কলকাতার সল্ট লেকের শরণার্থী। তারা সেখান থেকে বসন্তে আক্রান্ত হয়েই এখানে এসেছিল। 

চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগের মহিলা শাখা বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের কর্মসূচী নিয়েছে। এ উদ্দেশে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মর্জিয়া ইসলাম এবং প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন গণপরিষদ সদস্য নুরজাহান মুরশেদ। কমিটির আহ্বায়ক হন তোহফাতুন নেছা যুগ্ন আহ্বায়ক হন মিসেস মওলা।

বিবিসির বাংলা বিভাগের প্রধান সিরাজুর রহমান আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের সাক্ষাৎকার ধারণ করেছেন। সুবিমল দত্ত আজ বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগদান করেছেন।

সরকারী অফিসের সময় সূচী পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন অফিসের সময়সূচী ৯ টা – ৫ টা। ভাসানীকে দেখতে হাসপাতালে তাজ উদ্দিন সৈয়দ নজরুল অর্থমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদ এবং শিল্পমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মওলানা ভাসানীকে দেখতে গিয়েছিলেন। তারা একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছাত্রনেতা আসম রব এবং নুরে আলম সিদ্দিকিকে দেখতে যান।

অসুস্থ অবস্থায় তারা কেনেডির অনুষ্ঠান সূচীতে উপস্থিত ছিলেন এবং পরে তারা হাসপাতালে ফিরে আসেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মওলানা ভাসানী চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের কাছে লিখা এক চিঠিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার আহবান জানান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সকালে পুরাতন ঢাকার কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত মহল্লা পরিদর্শনে যান। তিনি জনগনের কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। এ সময় তার সাথে ছিলেন শহর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান আব্দুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

শহীদ খেলোয়াড়দের সাহায্যার্থে বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি আয়োজিত ঢাকা স্টেডিয়ামে এক প্রদর্শনী চ্যারিটি ফুটবল প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্রপতি একাদশ ২-০ গোলে প্রধানমন্ত্রী একাদশকে পরাজিত করে।

খেলার পূর্বে মুজিব নগর শিল্পীগন আধাঘণ্টা গণসংগীত পরিবেশন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট আবু সাইদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে সম্পূর্ণ খেলা উপভোগ করেন এবং তার অতীত খেলোয়াড়ী জীবন এবং বিভিন্ন সময়ের বিখ্যাত খেলোয়াড় সম্পর্কে প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন। প্রধানমন্ত্রী একাদশটি ছিল মুজিবনগরে গঠিত প্রবাসী ফুটবল দল।

খেলাটি বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চের পর ঢাকা স্টেডিয়ামে এটিই প্রথম কোন খেলা।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

রাজভবনে মুজিব ইন্দিরা বৈঠক৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ কলকাতার রাজ ভবনে সকালে মুজিব ইন্দিরা প্রথম বৈঠক হয়।

বৈঠক চলে দেড় ঘণ্টা। বৈঠক চলে একক ভাবে। এ ছাড়া বৈঠক হয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের সাথে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান ডিপি ধর ও প্রধানমন্ত্রীর সচিব হাকসারের। আরও বৈঠক হয় কর্মকর্তা পর্যায়ে ধরন ভিত্তিক গ্রুপ হিসেবে।

দুপুরে রাষ্ট্রীয় ভোজে অংশ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। ব্রিগেড ময়দান থেকে ফিরে এসে ২য় বৈঠকে অংশ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ বৈঠকে সাথে সহযোগীরা ছিলেন।

রাতে ভোজসভা শেষে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে রবি ঠাকুরের চিত্রাঙ্গদা মঞ্চস্থ করা হয়। সুচিত্রা মিত্র অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

রাজভবনে মধ্যাহ্ন ভোজ ও ইন্দিরা গান্ধীর সাথে ২য় দফা বৈঠক শেষে শেখ মুজিব হেলিকপ্টার যোগে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে গমন করেন। ব্রিগেড ময়দানের জনসভাকে মানব ইতিহাসের সবচে বড় জনসমাবেশ বলে আখ্যায়িত করা হয়। বাংলাদেশের চীনা বাম পত্রিকা সোনার বাংলা মতে সে সমাবেশে ত্রিশ লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ হয়েছিল। ব্রিগেড ময়দান ছাড়াও কলকাতার আরও ৭টি ময়দানে জনতা মাইকে ভাষণ শুনেছে। এ ছাড়া হাওরায় তিনটি সমাবেশে জনতা মাইকে ভাষণ শুনেছে। শেখ মুজিবুর রহমান তার ভাষণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ঘোষণা করেন। তার পর তিনি ঘোষণা করেন ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী চিরস্থায়ী হবে। কোন ষড়যন্ত্র বা কোন শক্তি এ বন্ধনে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না। তিনি বলেন উপমহাদেশে আর সাম্রাজ্যবাদীদের খেলতে দেয়া হবে না।

তিনি বলেন তার দেশে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ত্যাগ স্বীকার করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের জনগন, সরকার ও ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় খাদ্য দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ভাষণের কয়েক পর্যায়ে শেখ রবীন্দ্র নাথের কবিতা আবৃত্তি করে ব্যাখ্যা দেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভুমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং মার্কিন ভুমিকার তীব্র নিন্দা করেন।

পাকিস্তান সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন বাংলাদেশ স্বাধীন এবং সার্বভৌম দেশ। পাকিস্তানী নেতারা যদি বাংলাদেশ তাদের অংশ এখনও মনে করে তবে তাদের পাগলা গারদে পাঠানো ছাড়া আর উপায় নেই।  মুল মঞ্চের কাছেই আরেকটি মঞ্চ করা হয় সেখানে শতাধিক সংগীত শিল্পী অবস্থান নেয়।

মেয়ে শিল্পীরা লাল ব্লাউজ এবং সবুজ শাড়ী পড়েন। পুরুষ শিল্পীরা ভারতের পতাকার আদলে পোশাক পরেন। ভাষণের ফাকে ফাকে এবং অনুষ্ঠান শেষে সঙ্গীতানুষ্ঠান চলে।

শুরুতে এরা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং শেষে রন সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১৯৫২ সালের বাঙালি আর ১৯৭১ সালের বাঙালির মধ্যে পার্থক্য
কেন্দ্ৰীয় শহীদ মিনার

আজ মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি। শহীদ দিবসে আপনারা এখানে এসেছেন, ১২টা ১ মিনিটের সময় আমরা মাজারে গিয়েছি,  সেখান থেকে সোজা এখানে চলে এসেছি। বাঙালিরা বহু রক্ত দিয়েছে। ১৯৫২ সালে যে রক্ত দেয়া শুরু হয়েছে সে রক্ত আজো শেষ হয় নাই,  কবে শেষ হবে তা জানি না। আজ শহীদ দিবসে শপথ নিতে হবে,  যে পর্যন্ত না ৭ কোটি মানুষ তার অধিকার আদায় করতে না পারবে সে পর্যন্ত বাংলার মা-বোনেরা বাংলার ভাইয়েরা আর শহীদ হবে না,  গাজী হবে। 

আমরা জানি,  যে ষড়ষন্ত্রকারীরা ১৯৫২ সালে গুলি করে আমার ভাইদের শহীদ করেছিল,  তারা আজো তাদের কাজ শেষ করে নাই। ষড়ষন্ত্র আজও চলছে। ষড়ষন্ত্র ভবিষ্যতে চলবে,  কিন্তু বাংলাদেশের চেহারা তারা দেখে নাই। এ আন্দোলন ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ তারিখে শুরু হয়। ১৯৫২ সালে আমাদের ভাইয়েরা রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে বাংলা ভাষাকে অমর্যাদা করতে আমরা দেবো না। রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবো,  ইনশাল্লাহ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। যারা আজ বাংলার স্বাধিকারকে দমাতে চায়,  যারা আজ বাংলার সংস্কৃতি,  বাংলার মানুষকে আজ লুট করতে চায়,  কলোনি করতে চায়,  বাজার করতে চায়,  এত বড় বিজয়ের পরে যারা ষড়ষন্ত্র করতে চায়,  তাদের জেনে রাখা উচিত যে ১৯৫২ সালের বাঙালি আর ১৯৭১ সালের বাঙালির মধ্যে পার্থক্য আছে। তাই আপনাদের কাছে আমার আবেদন আজ পবিত্র দিন। আজ আমি বেশি কিছু বলতে চাই না। আপনাদের কাছে এইটুকু বলতে চাই,  আমাদের বাংলাদেশের ভাইয়েরা,  বোনেরা রক্ত দিয়ে দেখায়ে গেছে,  যে দরকার যদি হয় আমরা বাংলার মানুষ রক্ত দিতে জানি। আজ তাই এই শহীদ দিবসে শহীদদের আত্মার কথা মনে করে,  যারা শহীদ হয়েছে ১৯৫২ সালে,  ৫৪ সালের অত্যাচার,  ৫৮ সালের অত্যাচার,  ৬২ সালের শহীদ,  ৭ই জুনের শহীদ,  গত গণ আন্দোলনের শহীদ যাদের চিনি না নাম না জানা অজানা কত ভাই রক্ত দিয়েছে। বাংলার ঘরে ঘরে আজ শহীদ হছে মানুষ। শুধু গুলি খেয়ে শহীদ হচ্ছে না। না খেয়ে শহীদ হচ্ছে। কাপড় পায় না,  পেটে খাবার নাই,  শোষণ করে নিয়ে যাচ্ছে,  বাংলার মানুষকে বাজার করেছে,  বাংলার সম্পদ লুট করেছে,  বাংলার মানুষকে পথের ভিখারি করেছে। আমরা কারো ওপর বে-ইনসাফ করতে চাই না। পাঞ্জাবি তার অধিকার পাক,  সিন্ধ তার অধিকার পাক,  পাঠান তার অধিকার পাক,  বেলুচ তার অধিকার পাক,  আমিও বাঙালি আমিও আমার স্বাধিকার চাই। এখানে আপোষ নাই। 

তাই আপনাদের কাছে আজকে আমি অনুরোধ করবো বাংলার ঘরে ঘরে যান প্রস্তত হয়ে যান বাংলাদেশের ভায়েরা আর শহীদ নয়। বাংলার ছেলেদের গাজী হয়ে মার কোলে ফিরে যেতে হবে। শহীদ নয় গাজী। আর নয়,  আমাদের ভায়েদের কথা আমরা তুলতে পারি না। যাদের মা আজও কাঁদে। যাদের বাপ আজও কাঁদে। যাদের ছেলে-মেয়ে আজো বাপ মা করে চিৎকার করে বেড়ায়। তাদের আত্মা বাংলার ঘরে-ঘরে বাংলার দুয়ারে-দুয়ারে আজকে আঘাত করছে। বলছে,  বাঙ্গালি তুমি কাপুরুষ হযো না,  বাঙালি তুমি জানের জন্য ভয় কোরো না,  বাঙালি তুমি সংগ্রাম করে এগিয়ে যাও। তাই শহীদ দিবসে আজ আমরা শপথ নিয়েছি,  রক্ত দেবো,  দাবি ছাড়বো না,  দাবি আদায় করে ছাড়বো।

তাই আপনাদের কাছে আমার আবেদন রইল ভায়েরা,  সামনের দিন আরো কঠিন হবে বলে আমার মনে হচ্ছে। ষড়ষন্ত্রকারীরা ধামে নাই। তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা সকলের সহানুভুতি,  ভ্রাতৃত্ব কামনা করি তার অর্থ এই নয় যে আমার ৭ কোটি মানুষকে কেউ গোলাম করে রাখবে। তার অর্থ এই নয় আমার দেশকে কেউ বাজার বা কলোনি করে। রাখবে। যে রক্ত দিয়ে বাংলার মানুষ একদিন আগরতলা থেকে আমাকে বের করে নিয়ে এসেছিল আমি ওয়াদা করতে পারি তোমাদের কাছে এই শহীদ দিবসে আল্লাহর নামে আমার রক্ত দিয়ে তোমাদের রক্তদান আমি নিশ্চয়ই শোধ করতে চেষ্টা করবো।

তাই আজ আপনাদের কাছে বলে যাচ্ছি,  জীবনে মানুষ পয়দা হয় মৃত্যুর জন্য। বেঁচে আছি এ তো একটা এক্সিডেন্ট। আজ ঘুরছি কালও মরে যেতে পারি। যারা মরে গেছে তারা পথ দেখিয়ে গেছেন। যারা শহীদ হবেন তারাও পথ দেখিয়ে যাবেন। ভবিষ্যৎ বংশধর তারা মুখ উচু করে দাঁড়ায়ে দুনিয়া আসরে বলতে পারবে- আমি বাঙালি,  আমি মানুষ,  আমার স্বাধিকার আছে,  আমার অধিকার আছে।তাই আজকে শহীদ দিবসে আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ ঘরে ঘরে আপনারা দুৰ্গ গড়ে তোলেন। আমরা সকলের সহানুভূতি,  ভালোবাসা চাই। কারো প্রতি আমাদের হিংসা নাই। কেউ যদি অন্যায় করে আমাদের ওপর শক্তি ব্যবহার করতে চায় নিশ্চয়ই এদেশের মানুষ আর সহ্য করবে না। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল- যতদিন পর্যন্ত বাংলা থাকবে,  বাংলার আকাশ থাকবে,  বাংলার মাটি থাকবে ততদিন পর্যন্ত আমার একুশের শহিদের কথা কেউ ভুলতে পারবো না। কারণ ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এই ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না আমার বাংলার মাটিতে ছাড়।

এ আন্দোলনের সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ তারিখে আমি গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাই। ১৯৫২ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আমি জেলের মধ্যে অনশন ধর্মঘট করি আর আমার ভাইদের সঙ্গে আমি পরামর্শ করে ঠিক করি তারা ২১ শে থেকে আন্দোলন শুরু করবে। ২৭ তারিখে আমাকে স্ট্রেচারে করে বের করে দেয়া হয় জেলের থেকে,  আমি মরে যদি যাই জেলের বাইরে যেন মরি। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম। আজও জড়িত আছি। জানি না কতদিন থাকতে পারবো। আমি প্রস্তত আছি।

তবে আপনাদের কাছে আমার এইটুকু বলার রইল যে এই বাংলার মানুষ যেন আর অপমানিত না হয়। আর শহীদ যারা হয়ে গেছে এদের রক্তের সঙ্গে আমরা বেইমানি যেন না করি। মনে রাখবেন আপনারা নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেন এবং জানেন শহিদের রক্ত কোনদিন বৃথা যায় নাই,  আর যাবেও না ইনশাল্লাহ।

তাই আপনাদের কাছে বিদায় নিচ্ছি এই রাত্রিবেলা। জানি না কবে দেখা হয় আপনাদের সঙ্গে। আপনারা প্রস্তত হয়ে যান। ইনশাল্লাহু যখন রক্ত দিতে শিখেছি,  বাঙালি তার দাবি আদায় করবে।আসসালামু আলাইকুম।শহীদ স্মৃতি- অমর হোক,শহীদ স্মৃতি- অমর হোক,শহীদ স্মৃতি- অমর হোক।জয় বাংলা। 

Reference: পিপলস ভয়েস, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, প্রকাশনা শেকড় সন্ধান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

জানুয়ারি ১৯৪৯ (ঢাকা) এর গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ঐদিন সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের প্রায় ২০০ ছাত্র পাকিস্তানের স্লোগান নিয়ে আর সাথে সংগঠনের পতাকা নিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসে। এরপর তারা নাজিমুদ্দিন রোড, মিটফোর্ড রোড ও জনসন রোড দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাউন্ডে আসে। আসার পথে জে এন কলেজের ৫০ জন আর জুবিলি স্কুলের ২০ জন, আহমদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫০ জন ও আর্মানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১অ জন ছাত্র তাদের সাথে যোগ দেয়। এছাড়া গ্রাজুয়েট উচ্চ বিদ্যালয় ও পি এন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আরও ১০০ জন যোগ দেয়। দুপুর ১ টার মধ্যে সবাই জড়ো হয়। সেখানে ইতোমধ্যে মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ইডেন কলেজ থেকে শতাধিক ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলো।

তাদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নাইমুদ্দিন আহমেদ, পিতা খবিরুদ্দিন, রাজশাহী, শেখ মুজিবুর রহমান, পিতা লুতফর রহমান, টুঙ্গিপারা গোপালগঞ্জ, (ঢাকার ঠিকানা – ৯, দেবী দাস লেন, লালবাগ, ঢাকা), আইনের ছাত্র আজিজ আহমেদ, পিতা ফুলু মিয়া ভুঁইয়া, রাহুটিয়া, ফেনী, নোয়াখালী (ঢাকার ঠিকানা – মিটফোর্ড রোড, লালবাগ, ঢাকা), আইনের ছাত্র মির্জা গোলাম হায়দার (বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র) (ঢাকার ঠিকানা – নাজিরাবাজার, কোতোয়ালি, ঢাকা, আব্দুল মতিন চৌধুরী (বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র), আতাউর রহমান (বি এস সি স্টুডেন্ট দ্বিতীয় বর্ষ) সহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয় গেটে পিকেটিং করে।

এসময় আতাউর রহমান মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী নামক এক ছাত্রকে ক্লাসে যাবার জন্য মারধর করে। পরে শেখ মুজিবের হস্তক্ষেপে সেটা সমাধান করা হয়।

সোয়া একটার দিকে নাইমুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমান, দবিরুল ইসলাম চৌধুরী (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ) ও নাদিরা বেগম (পিতা – খান বাহাদুর এ এইচ চৌধুরী, খুলনা) বক্তব্য রাখেন। শেখ মুজিব বলেন, সরকার ছাত্রদের সমস্যা দেখছেনা। তিনি ঘোষণা করেন, ১ মাসের মধ্যে যদি এসব সমাধান না হয় তাহলে তারা ডাইরেক্ট একশনে যাবেন। তিনি কমিউনিস্টদের এই আন্দোলনে ঢুকতে নিষেধ করেন। নাদিরা বেগম ৫০ জন ছাত্রীসহ প্রায় ৫০০ ছাত্রকে নেতৃত্ব দেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১০ জানুয়ারি ১৯৪৯, ঢাকা।

৮ই জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট সম্পর্কে পূর্ব পাকিস্তানের উজিরে আজমের বিবৃতি দেখিয়া আমরা কিছুমাত্র বিস্মিত হই নাই। তিনি ফেলিস্তিন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের দোহাই দিয়া ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবীকে উড়াইয়া দিয়াছেন। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র সমাজের উপর নানা রকমের অকথ্য জুলুম চলিতেছে এবং তাকে আমরা সমস্ত জিলার ব্যাপারই জানাইয়াছি। যদিও তিনি অন্যান্য ছয়টি জেলার ছাত্রদের উপর অনুষ্ঠিত জুলুমের কথা ব্যক্ত না করিয়া কেবলমাত্র রাজশাহীর ঘটনাই উল্লেখ করিয়াছেন।

বারম্বার স্মারকলিপি দেওয়া সত্ত্বেও তিনি ছাত্রদের ন্যায্য দাবী না মানাতেই আমরা বাধ্য হইয়া জুলুম প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করিয়াছি। তিনি গোটা ছাত্র সমাজকে “রাষ্ট্রের দুশমন” এবং জুলুম প্রতিরোধ দিবসে বাষ্ট্রের পৃষ্ঠে “ছুরিকাঘাত” বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। জনাব নুরূল আমীন সাহেব যে ছাত্র লীগকে কমিউনিষ্ট ও পঞ্চম বাহিনী বলিয়াছেন, সেই ছাত্রলীগকেই তিনি ১০০/- সাহায্য করে পূর্ব পকিস্তানে মুসলিম ছাত্র লীগের সংহতি বাঁচাইয়া রাখিয়াছেন। বিগত ১১ই মার্চের আন্দোলনেও এইসব খেতাব দেওয়া হইয়াছিল

কিন্তু পরিশেষে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জনসাধারণের ন্যায্য দাবীকে সুস্থ্য জ্ঞানে মানিয়া লইয়া ছিলেন। ছাত্রসমাজ ও জনসাধারণকে “রাষ্ট্রের দুশমন” প্রভৃতি মামুলি বুলি দিয়া ভুল বুঝান অসম্ভব। এবার জনসাধারণের পূর্ণ সহানুভুতি ও সমর্থন আমাদের পিছনে রহিয়াছে, এ সম্বন্ধে আমরা সুনিশ্চিত।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২৯ জানুয়ারি ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ২৮ জানুয়ারি ১৯৪৯ তারিখে খুলনা মিউনিসিপাল পার্কে কৃষকদের সাথে এক সম্মেলনে শেখ মুজিব ভাষণ দেন।

সকাল ৮ টা ৪৫ মিনিটে শেখ মুজিব এবং খুলনার শামসুল আলম (পিতা – জানিমুদ্দিন, ঠোঁটপারা, খুলনা) ঐ সভায় উপস্থিত হন। সেখানে প্রায় ৩৫০ জন কৃষক উপস্থিত ছিলো। এরা ফরিদপুর, ঢাকা ও কুমিল্লা থেকে এসেছিলো। তিনি সবাইকে একসাথে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলোতে যেতে বলেন। দেওয়ালিয়া এবং শেখ মুজিব ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে। (নোট দেওয়ালিয়া হচ্ছে একটি আঞ্চলিক শব্দ। যারা ভূমিহীন কৃষক এবং ধান কাটে তাদেরকে বলা হয়। এসব কৃষকদের কাটা ফসলের একটা অংশ খাজনা হিসেবে দিতে হয়। সেটি না দিতে পারলে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ফসল নিতে দেওয়া হয়না। এতে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা আছে।) শেখ মুজিব বলেন, জেলা সিভিল সাপ্লাই অফিসার এসব কৃষককে ফসল তুলতে দিচ্ছেনা এবং নিতে অনুমতিও দিচ্ছেনা। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেওয়ালিয়াদের এবং শেখ মুজিবকে বলেন, এখানে তার কিছু করার নেই।

আইন অবশ্যই মানতে হবে। তার এই কথায় সন্তুষ্ট না হয়ে বিকেলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আবারো খুলনা মিউনিসিপাল পার্কে সবাই একত্রিত হয়। তিনি তাদেরকে বলেন, এত ঝামেলা করলে খুলনায় আর ধান কাটতে আসার দরকার নাই।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়,
গভর্ণর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন গোপালগঞ্জে আসা উপলক্ষে শেখ মুজিবের গ্রুপ এবং স্থানীয় এম এল এ শামসুদ্দিন আহমেদ খোন্দকারের গ্রুপের মধ্যে সঙ্ঘর্ষের মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবের গ্রুপ এলাকায় জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং খাদ্য সমস্যা সমাধানের জন্য দাবী তোলে।

সেখানে কিছু ব্যানারে লেখা ছিলো, “পদত্যাগ করুন, না হয় চেয়ার ছাড়ুন।“ এছাড়া কিছু লিফলেট বিলি করা হয় যেখানে খাদ্য, পোশাক সমস্যা, জনগণের থেকে বিভিন্ন উছিলায় অর্থ সংগ্রহ, দ্রব্যমূল্যের চড়া দাম ইত্যাদির সমালোচনা করা হয় এবং সমাধানের দাবী জানানো হয়।

পরিস্থিতির এক পর্যায়ে এম এল এ ক্ষিপ্ত হন এবং পুলিশকে তাদেরকে এরেস্ট করার নির্দেশ দেন।

কিন্তু লিফলেটের লেখা আইনবিরোধী না হওয়ায় পুলিশের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তবে, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ তারিখে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং এস পি শেখ মুজিবকে ডেকে গভর্ণর জেনারেল আসার দিনে কোন বক্তব্য দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু এটা আসলে স্থানীয় এম এল এর চক্রান্ত বুঝতে পেরে তিনি সেটা মেনে নেন নাই। ফলে, পরেদিন অর্থাৎ ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ গভর্ণর জেনারেল আসলে তার নৌকার চারপাশে অসংখ্য ছাত্র জড়ো হয় এবং “খাদ্য চাই, খাদ্য চাই” বলে চিৎকার করতে থাকে।

সেসময় শেখ মুজিবকে ম্যাজিস্ট্রেট আবার ডেকে পাঠান এবং বাকিদের উপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও এলাকা নজরদারীতে রয়েছে বলে রিপোর্টে লেখা হয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

৫ মার্চ ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায়,
২ মার্চ ১৯৪৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহবায়ক নাইমুদ্দিন আহমেদ এবং সেক্রেটারি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে প্রাত ১৫০ জন ছাত্রের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিব বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, কর্মচারিদের হরতাল চলমান থাকলে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হবে। অতএব তাদের যৌক্তিক দাবী কর্তৃপক্ষের মেনে নেয়া উচিৎ।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

মার্চ ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, সর্দারঘাটে প্রায় ২০০ ছাত্রের একটি মিছিল শেখ মুজিবুর রহমান, দবিরুল ইসলাম ও কল্যাণ দাস গুপ্তের নেতৃত্বে নবাবপুর রোড হয়ে দুপুর ১২ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে গিয়ে শেষ হয়। অপরদিকে, মৃণাল কান্তি বিশ্বাসের নেতৃত্বে (পিতা দোয়ারিকা নাথ বড়াই) দুপুর একটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে হাজির হয়।

এরপর দুপুর দেড়টার দিকে নাদিরা বেগমের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ ছাত্রী ও ১৫ জন ছাত্রের সমন্বয়ে একটি দলও হাজির হয়। এখানে আফজাল হোসেন, নাদিরা বেগম, মোখলেসুর রহমান (জগন্নাথ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ), রফিকুল ইসলাম (ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ), নুরুল হক (আর্মানিটোলা উচ্চ বিদ্যালয়) এবং বাহাউদ্দিন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি এ প্রথম বর্ষ) বক্তব্য রাখে। সভায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা করা নিয়ে ও খাদ্য ও বস্ত্র নিয়ে সরকারের পলিসির সমালোচনা করা হয়।

একই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারিদের মিটিং অনুষ্ঠিত হয় বিকেল পাঁচটার দিকে। আব্দুর রহমান এতে নেতৃত্ব দেন। পরে তারা ছাত্র নেতাদের সাথে যুক্ত হবার জন্য ঢাকা হলের দিকে যান। এরপর কল্যাণ দাস গুপ্ত এবং শেখ মুজিবের নেতৃত্বে এফ এম হল, এস এম হল এবং ইকবাল হলে যান।

সেখান থেকে মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আসতে থাকে এবং কল্যাণ দাস গুপ্ত আজাদ অফিসের দিকে চলে যান। শেখ মুজিবুর রহমান কর্মচারিদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞ্যাপন করেন। এই আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হচ্ছেন,

১। শেখ মুজিবুর রহমান (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ)
২। আখলাকুর রহমান (এস এফ)
৩। অরবিন্দু বসু (এস এফ)
৪। কল্যাণ দাস গুপ্ত (আর এস পি)।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

৮ এপ্রিল ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়,
৪ এপ্রিল ১৯৪৯ তারিখে ১৫০, মুঘলটুলিতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের একটি গোপন মিটিং হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমান, আজিজ আহমেদ, আব্দুল ওয়াদুদ উপস্থিত ছিলেন।

তারা সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস শাখার ডিন Dr. W. H. A. Shadani কর্তৃক বাঙালি নারী ও ছাত্রীদের সম্পর্কে অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করার অপরাধে তার পদত্যাগ দাবী করার সিদ্ধান্ত নেয়।

এছাড়া এটি রেডিও পাকিস্তানে প্রচার করার কারণে উক্ত রেডিও কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১৮ এপ্রিল ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়,
১৭ এপ্রিল ১৯৪৯ তারিখে সকাল ১০টার দিকে শেখ মুজিবুর রহমান, আব্দুর রহমান চৌধুরী, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, আব্দুল ওয়াদুদ, নাদিরা বেগম এবং আজিজ আহমেদ (সাবেক ছাত্র ঢাবি) এর নেতৃত্বে ছাত্রদের একটি গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয় গেটের সামনে ছাত্রদের বিরুদ্ধে দেয়া নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার দাবীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

তারা গেট বন্ধ করে দেয় এবং ছাত্র ও শিক্ষকদের ক্লাসে প্রবেশ না করতে অনুরোধ করে। এসময় শাহ আজিজুর রহমান, দলিলুদ্দিন ও আরও কিছু ছাত্র (এরা সকলেই পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের) হরতালের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ক্লাসে প্রবেশ করতে চেষ্টা করে। প্রায় দুই ঘণ্টা বাকবিতণ্ডা চলে এবং কেউই ক্লাসে প্রবেশ করতে পারেনি।

দুপুর ১২ টার দিকে ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের কিছু ছাত্র ঢাকা মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের আরও কিছু ছাত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে যোগ দেয়।

তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র শামশুল আলমের সভাপতিত্বে মিটিং করে। শেখ মুজিবুর রহমান, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, আব্দুল ওয়াদুদ এবং নাদিরা বেগম বক্তব্য দেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন ২৭ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে নেয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। প্রায় ৫০০ ছাত্র এখানে উপস্থিত ছিলো।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২৮ এপ্রিল ১৯৪৯ সালের গোপন রিপোর্টে জানা যায়,
মাদারীপুর নাজিমুদ্দিন কলেজের শিক্ষক ও স্থানীয় মুসলিম লিগাররা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত মুসলিম ছাত্রলীগ এর শাখা খুলতে বাধা দিচ্ছে। কারণ তারা মনে করে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বের সংগঠনের শাখা খোলা হলে সেটি সরকার বিরোধী কাজ করবে। সে সোহরাওয়ার্দীর সমর্থক এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে চেষ্টা করে যাচ্ছে। নাজিমুদ্দিন কলেজের ছাত্ররা স্থানীয় নেতাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় কমিটি করতে সমস্যা হচ্ছিলো। তবে পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসে নাজিমুদ্দিন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র লুতফর রহমান ভুঁইয়া ওরফে বাদল (পিতাঃ আব্দুল লতিফ ভুঁইয়া) এর সাথে প্রিন্সিপ্যাল ড মহিউদ্দিনের সাথে বাকবিতণ্ডায় জড়ায়।

কারণ ছিলো নাটক প্রদর্শনির অভিনেতা নির্বাচন নিয়ে মতানৈক্য। ফলে বাদলকে কলেজ ছাড়তে হয়। সেই সুবাদে মাদারীপুরের সাব ডিভিশনাল মুসলিম ছাত্রলীগের সাবেক প্রেসিডেন্ট খন্দকার আব্দুল হামিদ (মুজিবের লোক) নাজিমুদ্দিন কলেজে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের শাখা গঠন করতে সমর্থ হয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

মে ১৯৪৯, ঢাকা

আমার নাম শেখ মুজিবুর রহমান, পিতা- মৌলভি শেখ লুৎফর রহমান, টুঙ্গিপাড়া, থানা- গোপালগঞ্জ, জেলা- ফরিদপুর। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমার একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের গোপালগঞ্জের এস এন একাডেমি থেকে এ-ই বছর মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। আমার চার বোনের নাম- (১) ফাতেমা বেগম (২) আছিয়া বেগম (৩) আমেনা বেগম এবং (৪) লায়লা বেগম। আমি ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জের মিশন স্কুল থেকে মেট্রিক, ১৯৪৫ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৭ সালে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। বর্তমানে আমার বয়স প্রায় ২৮ বছর।

 ১৯৩৭-৩৯ সাল পর্যন্ত আমি মুসলিম ছাত্রলীগের গোপালগঞ্জ উপশাখার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছিলাম। আবার আমি ১৯৩৯-৪২ সাল পর্যন্ত গোপালগঞ্জ শাখার মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও ছিলাম। ১৯৪২-৪৩ সাল পর্যন্ত আমি গোপালগঞ্জ মুসলিম লীগ প্রতিরক্ষা কমিটির ও সম্পাদক ছিলাম৷ ১৯৪০-৪৭ সাল পর্যন্ত আমি ফরিদপুর জেলায় মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগকে সংগঠিত করি। ১৯৪৩-৪৪ সাল পর্যন্ত আমি বাংলা প্রদেশের মুসলিম লীগ রিলিফ কমিটির সেক্রেটারি মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর সহকারী হিসেবে কাজ করেছি। নাটোর ও বালুঘাট উপ-নির্বাচনে আমি মুসলিম লীগের পক্ষ হয়ে ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদ মিনিস্ট্রির বিরুদ্ধে কাজ করেছি। ১৯৪৩ সালে গোপালগঞ্জ সমাবেশে আমি অভ্যর্থনা কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি যেখানে পাকিস্তান সংবিধান পরিষদের সভাপতি জনাব তমিজুদ্দিন খান, পাকিস্তান অংশের প্রচার ও অভ্যন্তরীণ  কমিশন এর দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্মানিত মন্ত্রী খাজা সাহাবুদ্দীন সহ প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৪৪ সালে কলকাতা করপোরেশন নির্বাচনে আমি মুসলিম লীগের হয়ে কাজ করি। ১৯৪৫-৪৬ সালে আমি বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ড কর্তৃক ফরিদপুর জেলার মুসলিম লীগের নির্বাচন ও প্রচার অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। সেখানে আমার অধীনে ৬টি নির্বাচনী এলাকা ছিল।

আমি দিল্লীতে অনুষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের সমাবেশে বাংলা প্রদেশের একজন প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম যেখানে কায়েদ-ই-আযম সভাপতিত্ব করেছিলেন। একইভাবে ১৯৪৬ সালে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় মুসলিম লীগের বিশেষ সম্মেলনে অংশ নেই যেখানে আমি কায়েদ-ই-আযমের কাছে পাকিস্তান অর্জনে জীবন দিয়ে দেওয়ার শপথ নিয়েছিলাম। বিহারে দাঙ্গার সময় আমি সেখানে বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলাম। ১৯৪৬ সালে প্রায় ৩ মাসের মত বিহার শরণার্থী ক্যাম্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আসানসোল, কান্দুলিয়া, মাদাইগঞ্জ, মায়েরা, নাইগা ইত্যাদি অঞ্চলে কাজ করেছি।

কলকাতা দাঙ্গার সময় আমি একইসাথে কলকাতা মুসলিম ছাত্রলীগ, ব্রাভর্ন কলেজের শরণার্থী ক্যাম্প এবং মুসলিম লীগের অফিসে দায়িত্বে ছিলাম। ১৯৪৭ সালে আমি সিলেটের ৩০০ ভলান্টিয়ারের দায়িত্বেও ছিলাম। এছাড়াও আমি ১৯৪৩-৪৮ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কাউন্সিলর ছিলাম।

১৯৩৮-৪৭ সাল পর্যন্ত আমি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সদস্য ছিলাম। দেশভাগের পর থেকে আমি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ এর একজন সদস্য হিসেবে কাজ করছি। সি.পি. কিংবা পূর্ব পাকিস্তানের অন্য কোন রাজনৈতিক দলের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ জন শিক্ষার্থীর শাস্তির বিরুদ্ধে হওয়া সাম্প্রতিক হরতালে আমি যোগ দিয়েছিলাম। তবে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিরোধে অংশ নেইনি। ১৯.৪.১৯৪৯ তারিখের ১৬.১০ মিনিট এ আমাকে আরো ৬ জন শিক্ষার্থীর সাথে গ্রেপ্তার করেন ডি.এম., ডি.আই.জি এবং শহরের এস.পি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অফিস থেকে আমাকে জেলে নিয়ে আসা হয়।
(অনুবাদ – Ainul Hossain) [1, pp. 146–148]

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

পাকিস্তান গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ৯ মে ১৯৪৯ তারিখে চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে আসে।

শেখ মুজিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে মীমাংসা করবে কিনা সেই ব্যাপারে মৌলভি ফজলুল কাদের চৌধুরী জানতে চান। শেখ মুজিবুর রহমান বলেন তিনি কারো সাথেই কোন আপোষ করবেন না এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমা চাইবেন না।

ভিসির রুমের বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ফ্যান নষ্ট করার যে অভিযোগ তাকে দেয়া হয়েছে তিনি তা অস্বীকার করেন। এছাড়া ছাত্রদের দ্বারা ভিসির অপদস্থ হবার ঘটনাও সত্য নয় বলে দাবী করেন।

এছাড়া তিনি বলেন, ছাত্ররা যে হরতাল করছে তাতে কমিউনিস্টদের কোন ইন্ধন নেই। বরং তিনি বলেন, কমিউনিস্টদের হাতে নিম্নশ্রেণীর আন্দোলন যাতে চলে না যায় সেকারণেই তারা কর্মচারিদের আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি বলেন এই ঘটনায় ছাত্রদের কোন দোষ নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযথা পুলিশ ডেকে ছাত্রদের নাজেহাল করেছে।

ফজলুল কাদের চৌধুরী জানায় যে, যদি এই আন্দোলন আরও চলতে থাকে তাহলে অনেক ছাত্রকে তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হতে পারে। অতএব আপোষ করে ফেলাই উত্তম। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে মাফ চাওয়ায় অপমানের কিছু নাই। কারণ সম্পর্কটা অনেকটা পিতা-পুত্রের মত। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ছাত্ররা ক্ষমা চাইবার জন্য প্রস্তুত থাকলেও কিছু মন্ত্রীর কারণে (নাম উল্লেখ করেন নাই) তা হয়নি। অতএব, ছাত্রদের ইজ্জতের কথা বিবেচনা করে তিনি কোন মাফ চাইবেন না। অন্ততপক্ষে, ব্যক্তিগতভাবে নয়।

তখন ফজলুল কাদের চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন কোন ভাবে আপোষ হতে পারে কিনা? তখন শেখ মুজিব বলেন, আগামীকাল (১০ মে ১৯৪৯) সকাল সাড়ে দশটায় জেলারের মাধ্যমে ফোন করে তিনি ফজলুল কাদের চৌধুরীকে সিদ্ধান্ত জানাবেন।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২৫ মে ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কিছু তথ্য উল্লেখ করা হয়। রিপোর্ট প্রদানকারী ব্যক্তি কারাগারে বন্দী শেখ মুজিবকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে রিপোর্টটি প্রস্তুত করে। রিপোর্টে যা আছে তা এরকম। শেখ মুজিবের বয়স ২৮ বছর। তার বাবা মুন্সেফ কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত সেরেস্তাদার।

তিনি প্রতি মাসে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পেনশন ওয়ান।  তার পরিবারে আয়যোগ্য আর কোন সদস্য নাই। শেখ মুজিবের পিতার প্রায় ১০০ বিঘা খাস আবাদি জমি আছে। তার বাবা কোন আয়কর দেন না। তিনি একজন তালুকদার এবং সন্মানিত ব্যক্তি

মুজিবুর রহমান বিবাহিত। বৈবাহিক সূত্রে তার কিছু জমি আছে। তা থেকে তার মাসে প্রায় দুই হাজার টাকার মত আয় হয়। আটক হবার সময় সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ছিলো। নিজের মাসিক আয়ের বাইরে সে তার বাবার থেকে প্রতি মাসে হাতখরচ পায়। তার অন্য কোন আয়ের উৎস নাই।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২৬ জুন ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ২৪ জুন ১৯৪৯ তারিখে এডভোকেট আতাউর রহমানের সভাপতিত্বে মুসলিম লীগ কর্মি সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান জনগণের মুসলিম লীগ নামে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ গঠিত হয়েছে। আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রাক্তন সভাপতি মওলানা ভাসানী চেয়ারম্যান এবং শামসুর রহমান এম এন এ কে সেক্রেটারি করা হয়েছে।

নিরাপত্তা বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানকে জয়েন্ট সেক্রেটারি করা হয়েছে।এই ব্যাপারে কোলকাতা থেকে মানিক নামে একজন ব্যক্তি সোহরাওয়ার্দীকে করাচীতে একটি চিঠিতে বিস্তারিত জানান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

৩০ জুন ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ২৬ জুন ১৯৪৯ তারিখে ছাত্রনেতা মুজিবুর রহমান ও বাহাউদ্দিনে মুক্তি পেয়েছেন যে সংবাদটি ইত্তেহাদ পত্রিকায় ২৭ জুন ১৯৪৯ তারিখে প্রকাশিত হয়। পত্রিকার একটি কপি সংযুক্ত আছে। [1, pp. 208–209] মুক্তির পর একটি শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাদের শাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সংবর্ধনা দেয়া হয়।

উল্লেখ করা হয় যে, মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য ২০ জুন ১৯৪৯ তারিখ ঢাকা হাই কোর্টে হেবিয়াস কর্পাসের দরখাস্ত করা হয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১ জুলাই ১৯৪৯ তারিখের গোপন রিপোর্টে জানা যায়, ১৩ জুন ১৯৪৯ তারিখে শেখ মুজিব বরিশালে স্থানীয় পরিচিত কিছু মুসলিম ব্যক্তির সাথে দেখা করেন এবং নাজিমুদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালান।

তিনি অতি বিলম্বে ভাসানীকে সোহরাওয়ার্দীর সমর্থনে এসেম্বলি থেকে পদত্যাগের আহ্বান জানান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২৩ জুলাই ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ৬ জুলাই ১৯৪৯ তারিখে গোপালগঞ্জে বাংলায় ৩ পাতার একটি প্যামপ্লেট (লিফলেটসদৃশ) বিলি করা হয় যার শিরোনাম ছিলো “দেশের স্বার্থে জেলবন্দি বীর” এটি দুই আনায় বিক্রি করা হয়। সম্পাদক ছিলেন শাহাদাত হোসেন।

এটি প্রকাশ করেছেন ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের এম এ কোর্সের ছাত্র শামশুল আলম শরিফ। এতে জনগণের স্বার্থে এবং পাকিস্তানের স্বার্থে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান তুলে ধরা হয়। বলা হয়, দেশের মুসলমান সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তির পথিকৃৎ শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন করে তাকে জেল খাটতে হয়। আবার ১৯৪৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন কর্মচারিদের জন্য আন্দোলন করায় বহিষ্কৃত ছাত্রদের পক্ষে প্রতিবাদ করায় তাকে জেলে যেতে হয়। পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল নেতাদের মধ্যে সে সবচেয়ে সাহসী এবং তাকে বন্দী রাখা হলে সেটি গোপালগঞ্জ সাবডিভিশনের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী হবে।

সে জেলে বন্দী থাকলে সেই সুযোগে শামসুদ্দিন আহমেদ এম এল এ এবং ওয়াহিদুজ্জামান ঠাণ্ডা মিয়াঁর মত সুযোগ সন্ধানী লোকেরা সমাজসেবার নামে গোপালগঞ্জের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। এবং তাদের দ্বারা এলাকার শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার চলমান প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে।

তাদের চক্রান্তে দেশের মানুষ অশিক্ষার করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাবে। দেশের এই দুর্যোগময় সময়ে হিন্দু মহাসভার দালালরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় আরও জোরদার বাধা দিতে থাকবে।

এছাড়া জানা যায় যে, তারা গোপালগঞ্জ মসজিদ ফান্ডের একাউন্ট নিয়েও টালবাহানা করছে। এসব লোক সম্পর্কে গোপালগঞ্জের এলাকাবাসীর সজাগ থাকা উচিৎ। যদিও মুজিবুর রহমান জেলে আছেন, তথাপি তার সমর্থকরা সার্বক্ষনিক এসব বিষয়ে সজাগ থাকবে বলেও প্রচার করা হয়।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২০ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায় ১০ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আলাদা ছাত্র সংগঠনের দাবীতে গোপালগঞ্জের এস এন একাডেমীর প্রায় ১৫০ জন ছাত্র শহর প্রদক্ষিণ করে। উল্লেখ্য, সেখানে তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিলো। যেসব ছাত্ররা নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে,

১। আবু আব্দুল্লাহ, পিতা- মৌলভি জয়নাল আবেদিন, লইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট। আবু আব্দুল্লাহ এস এন একাডেমীর দশম শ্রেণীর ছাত্র।
২। আব্দুল মান্নান শেখ, পিতা- আজহারউদ্দীন, বনগ্রাম, গোপালগঞ্জ।
৩। ফজলুর রফিক ওরফে খোকা, পিতা- আব্দুল মজিদ লশকর, গোপালগঞ্জ সিভিল কোর্টের সেরেস্তাদার।
৪। মুকুল মিয়া, এস এন একাডেমীর দশম শ্রেণীর ছাত্র।

ছাত্ররা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আলাদা সংগঠনের দাবী সংবলিত লিফলেটও বিলি করে।

পরের দিন লিফলেট বিলি করার সময় কয়েকজনকে আটক করা হয়। পরবর্তিতে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। লিফলেটে বলা হয়, সোহরাওয়ার্দীর দল পাকিস্তানের জনগণকে ভুল বোঝাচ্ছে। একারণে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব মুসলিম লীগের বাইরে আলাদা সংগঠন করা জরুরী। যারা আটক হয় তারা হলেন,

১। আবু আব্দুল্লাহ, পিতা- মৌলভি জয়নাল আবেদিন, লইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট। আবু আব্দুল্লাহ এস এন একাডেমীর দশম শ্রেণীর  ছাত্র।
২। এ কে এম মোহাম্মদ আলী বিশ্বাস, আই এ এর ছাত্র, পিতা- আব্দুল মজিদ বিশ্বাস, বর্ণি, গোপালগঞ্জ।
৩। আব্দুল মান্নান শেখ, পিতা- আজহারউদ্দীন, বনগ্রাম, গোপালগঞ্জ।
৪। সাইদুল হক বিশ্বাস ওরফে দুদু মিয়া, পিতা- জহুরুল হক, বর্ণি, গোপালগঞ্জ।
৫। গোলাম আক্কেল, দশম শ্রেণীর ছাত্র, এস এন একাডেমী, গোপালগঞ্জ।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২০ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায় ১০ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখে জামালপুর ঈদগাহ ময়দানে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভায় শেখ মুজিব, মওলানা ভাসানি ও শামসুল হক বক্তব্য দেন। সভায় তারা উচ্চপদের কর্মচারিদের বেশী বেতন এবং নিম্নপদের কর্মচারিদের কম বেতনের বৈষম্যের সমালোচনা করেন। এছাড়া এখানে যেসব রেজোল্যুশন গৃহীত হয় সেগুলো হচ্ছে,

১। বর্তমান মন্ত্রীপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচন দিতে হবে।
২। মন্ত্রী ও আমলাদের স্বজনপ্রীতি ও তাদের সম্পত্তির পরিমাণের ব্যাপারে তদন্ত করতে হবে।
৩। কোন ক্ষতিপূরণ ছাড়া জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে।
৪। পাটের মন প্রতি নূন্যতম মজুরি ৫০ টাকা করতে হবে।
৫। অতি সত্বর চট্টগ্রাম পোর্টের উন্নয়ন করতে হবে। ইত্যাদি। 

পরবর্তীতে ১৮ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখে আর্মানিটোলায় এক সভায় শেখ মুজিব বলেন, ছাত্রদের উপর পুলিশের নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের রুখে দাঁড়াতে হবে। জেলে বন্দী সকল ছাত্রদের নিস্বর্ত মুক্তি দাবী করেন।

এছাড়া মন্ত্রী সহ সকল সরকারী কর্মচারিদের জন্য নতুন পে স্কেল প্রণয়নের দাবী জানান, এবং বলেন, মন্ত্রীদের বেতন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার মধ্যে রাখতে হবে।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২৫ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখের পাকিস্তানী গোয়েন্দা রিপোর্টে শেখ মুজিব লিখিত ২১ আগস্ট ১৯৪৯ তারিখের একটি চিঠি পাওয়া যায় যেটি সৈয়দ মোঃ সোহেল ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে লেখা।

এতে লেখা ছিলো,

১৫০, মোগলটুলি, ঢাকা।
২১/০৮/১৯৪৯

জনাব,
আশা করি মানিক ভাইয়ের চিঠির সাথে আমি যে চিঠিটা আপনাকে পাঠিয়েছিলাম সেটা হাতে পেয়েছেন। সেখানে লিখিত পয়েন্টগুলো নিয়ে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন। আপনি নিশ্চই বুঝতে পারছেন। প্রেসিডেন্ট সাহেবের শাসনের বেশ অবনতি হয়েছে। সব রকমের শোষণ-নির্যাতন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি, আমাদের কর্মীদের আটক, হয়রানি সব যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গেছে। এর ভেতরেও আমাদের দলের কাজ অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুতগতিতে আগাচ্ছে। কিন্তু সংগঠন হিসেবে আমাদের সব কাজ প্রকাশ করা উচিৎ নয়। কিছুদিন আগে আমরা আর্মানিটোলা ময়দানে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে একটা মিটিং করেছি। কিন্তু সরকারদলীয় লোকেরা মিটিংটা ছত্রভঙ্গ করে দিতে সব রকমের চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু তাদের সব চেষ্টাই বৃথা হয়। এবং আমরা খুব সফল একটা মিটিং করি। প্রায় ৫০ হাজার লোক সমাগম হয়েছে। পাবলিসিটির জন্য আমাদের যেখানে থাকার কথা সেই পর্যায়েই আছি। আপনি নিশ্চই বুঝতে পারেন আমাদের হাজারটা সমস্যার সাথে আগাতে হচ্ছে। এও জানেন কোথায় কোথায় আমরা সমস্যায় পড়তে পারি। মফস্বলে আমাদের কর্মীরা যথেষ্ট হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছে। আজ আমি বরিশাল আর গোপালগঞ্জে যাচ্ছি। সেখানে আমাদের কর্মিদের মারধর করা হয়েছে। কেউ কেউ এরেস্ট হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্স ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৯ তারিখে হবে বলে নির্ধারন করা হয়েছে। মিয়া মঞ্জুরুল আলম, জনাব আব্দুস সাত্তার খান, নিয়াজমি (সাবেক এম এল এ পাঞ্জাব) এবং পশ্চিম পাঞ্জাবের জনাব গোলাম নবীর সম্বোধন কী হবে সেটা কি একটু জানাবেন? আপনার থেকে জানার পরে আমরা তাদের জন্য কার্ড ইস্যু করে পাঠাবো।

আপনি ঢাকা কবে আসছেন? অনেক বিষয়ে আপনার সাথে সামনাসামনি কথা বলার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। মানিক ভাই কিছুটা অসুস্থ আছে। তবু আমরা তাকে আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের চার্জ নিতে বলেছি।

আমরা আপনাকে ফোনে চেষ্টা করেছিলাম। তিন দিন আগেও অনেক রাত পর্যন্ত চেষ্টা করেছি। রাত ২ টার দিকে করাচী টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে বলেছে আপনি বাসায় নাই।

 

শুভ কামনা রইল।
আপনার স্নেহভাজন,
শেখ মুজিবুর রহমান (স্বাক্ষর)

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তারিখে ঢাকার তাজমহল সিনেমা হলে পূর্ব বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগের একটি ক্যামেরা মিটিং হয়। সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারি শেখ মুজিবুর রহমান। এতে প্রাদেশিক কার্যনির্বাহী কমিটি গঠিত হয়। সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দবিরুল ইসলাম (নিরাপত্তা বন্দী), ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সিরাজুল ইসলাম ও আজিজ আহমেদ, সেক্রেটারি হিসেবে আব্দুল খালিক নেওয়াজ খান সহ আরও ২৫ জনের সমন্বয়ে কমিটি গঠিত হয়।

সভাপতির ভাষণে শেখ মুজিব বলেন, পাকিস্তানের মত দেশ যেখানে শতকরা মাত্র পাঁচ শতাংশ লোক শিক্ষিত, সেখানে দেশের নানাবিধ সমস্যা ও অধিকার আদায়ে ছাত্রদের এগিয়ে আসতে হবে। সকল শোষণ ও নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে তাদের চুপ করে থাকা চলবেনা। সম্প্রতি সরকার নিয়ম করেছে, যেসব ছাত্র এসব কাজ করবে তাদের বৃত্তি বাতিল করা থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। তিনি এই আইনের চরম সমালোচনা করেন এবং অতি সত্বর এটি তুলে নেবার দাবী করেন।

শেখ মুজিব ছাত্রদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে অনুরোধ করেন। এর জন্য পাঠচক্র, ডিবেট সোসাইটি সহ দেশে শিক্ষিতের হার বাড়ানোর জন্য প্রচার চালাতে বলেন। অতি দ্রুত সরকার যাতে একটি নির্বাচন দেয় তিনি সেই দাবী করেন। সারা দেশে সরকার কর্তৃক মানুষের স্বাধীনতা হরণ, সংগঠন ও সংবাদপত্রের উপর কালো আইন ইত্যাদি তুলে নিতে বলেন। এছাড়া সরকার কর্তৃক আরবি হরফে বাংলা চালু করার প্রতিবাদ করেন। সরকার তাদেরকে অন্যায়ভাবে কমিউনিস্ট হিসেবে আখ্যা দেয়, যা তিনি অস্বীকার করেন।

তবে তিনি এও বলেন, সত্যিকারের মুসলমান জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করে যাবেন। 

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ১৬ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা ৩৫ মিনিটে ঢাকার আর্মানিটোলায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্স হয়। পবিত্র কোরআন পাঠ দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। ভাসানীর মওলানা আব্দুল হামিদ খান এতে সভাপতিত্ব করেন। শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা অনেক মিটিং করেছি এবং কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের কাছে আমরা অসংখ্য রেজোল্যুশন পাঠিয়েছি। কিন্তু কোন ফল হয়নি। সরকার কি অন্ধ? আমি ডাইরেক্ট একশনে বিশ্বাস করি।

পাকিস্তান ডাইরেক্ট একশনের ফলেই সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। যেসব হিন্দু ভারতে চলে গেছে তাদেরকে সরকার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে। ভারতের সকল মুসলমানদের সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এমনকি কায়েদে আজমের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এবং তার উপর আমরা তাদেরকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৬০ কোটি রুপী দিচ্ছি। এটা কি ন্যায্য বিচার? আপনাদের মনে রাখা উচিৎ, যখন মানুষ বিচার পায়না, তখন শানিত তলোয়ার বিচারের ভার নিয়ে নেয়।

আমরা তিনটি জিনিস চাই- খাদ্য, শিক্ষা এবং মিলিটারি ট্রেনিং। দেশকে রক্ষা করতে সকলকে মিলিটারি ট্রেনিং দেয়া উচিৎ। নেতারা আসলে মন্ত্রী হবার জন্য দেখান যে তারা দেশকে ভালোবাসেন। তারা বিমানে করে ঘুরে বেড়ান, কিন্তু দেশের বিপদের সময় তাদের কাউকেই পাওয়া যাবেনা। পাঞ্জাবী সেনারা বাংলার ভূপ্রকৃতির সাথে টিকে থাকতে অভ্যস্ত নয়। ফলে আমাদেরকেই নিজ ভূখণ্ড রক্ষা করতে হবে।

একইভাবে যদি আপনারা জীবন দিতে প্রস্তুত থাকেন নুরুল আমিন আমাদের খাবার না দিয়ে পারবেনা। কোন স্বাধীন দেশে খাদ্যের অভাবে যদি একজন মানুষও মারা যায় তাহলে সেদেশের মন্ত্রীদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়। মন্ত্রীদের গাড়ি থেকে টেনে বের করা হয়, বাড়ি থেকে নামীয়ে দেয়া হয়।

সারা দেশের নিরক্ষতা দূরীকরণে আমি ছাত্রদের ঝাঁপিয়ে পড়তে অনুরোধ করছি। ম্যাট্রিক পাশ মোক্তার যদি মন্ত্রী হতে পারে, তাহলে আমরা গ্রাজুয়েটরা কেন পারবো না? এম এল এ দের জন্য বিশেষ সুবিধা নয়, বরং আমরা চাই অতি সত্বর নির্বাচন। যদি আওয়ামী লীগের কর্মি বা কোন ছাত্রের উপর নিপীড়ন চলে তাহলে হাজার হাজার মুসলমান যুবক প্রাণ দেবে। ছাত্রদের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করার চক্রান্তে মন্ত্রীদের বাড়ীতে মিটিং হয়।

অনেক টাকা ঢালা হয়। আপনাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে দুজনেই সমান অপরাধী। অতএব আপনাদের কাজে নেমে পড়তে হবে। সফলতা সুনিশ্চিত।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২১ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ৩০ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে দিল্লি থেকে বিমানযোগে লাহোর আসেন। বিমান বন্দরের সি আই ডি অফিসারকে আগে থেকে সতর্ক করা হলেও ঐদিন গোয়েন্দা অফিসার তাকে সময়মত সনাক্ত করতে পারে নাই। ফলে লাহোরে আসার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ সম্ভব হয়নি। শেখ মুজিব মামদুত ভিলায় যান। সেখানে সোহরাওয়ার্দী সাহেব আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন। তবে থাকার জন্য মিয়া ইফতেখার উদ্দিনের বাসায় ব্যবস্থা করা হয়।

ঠিকানা, ২১, আইকমান রোড, লাহোর। তার আসার কিছুক্ষণ পর সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকপত্তনের একটি জনসভায় যান। পরের দিন একই যায়গায় তাদের দেখা হয়। সেখানে মামদুত খানের পূর্ব পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে নেয়া ২ লাখ টাকার মামলার ব্যাপারে আলোচনা করেন। টাকাটা খান সাহেব পূর্ব বাংলা থেকে নিয়েছিলেন। এছাড়া, পশ্চিম পাঞ্জাবে আওয়ামী লীগের শাখা চালু করার সম্ভবনা নিয়েও আলাপ করেন। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিকরা শেখ মুজিবের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটি শুধুই ব্যক্তিগত সফর। এর কোন রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। তবে তিনি জানান, মুসলিম লীগ বর্তমানে জনসংশ্লিষ্টতা হারিয়েছে এবং সরকারি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম পাঞ্জাবে আসন্ন নির্বাচনের আগে সেখানে আওয়ামী লীগের শাখা চালুর ব্যাপারে তিনি মত দেন। তিনি বলেন, এর ফলে সরকারের জবাবদিহিতা বাড়ানো যাবে এবং উন্নত দেশের মত এখানেও একটি সুস্থ বিরোধী  রাজনৈতিক চর্চা সম্ভব হবে।

সরকার কর্তৃক পূর্ব বাংলা ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে তার প্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। শেখ মুজিব আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে এই ব্যাপারে কথা বলতে তিনি করাচী যাবার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন। পশ্চিম পাকিস্তান আসার পর কিছুদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন।

২১ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে আই বি’ব সহকারী পরিচালক ঢাকায় একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট পাঠান, যাতে শেখ মুজিবের ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গোলাম মোহাম্মদ লান্দখোরের (Lundkhore) সাথে রাওয়ালপিণ্ডিতে এক বৈঠকের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়। এটি ৭ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুজনেই চম্বলপুরে পির মানকি শরিফের সাথে দেখা করতে যান। সেখানে ৯ নভেম্বর তারিখে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। এতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০ জন নেতাকর্মীকে সরকার কর্তৃক আটক করার বিষয়টি তোলেন।

এই আটক সরকারি অর্ডিনেন্সের অবৈধ প্রয়োগ, উল্লেখ করে শেখ মুজিব বলেন, অতি স্বত্বর পশ্চিম পাঞ্জাব ও সিন্ধে আওয়ামী লীগের শাখা খুলতে হবে। সরকার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দমনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার তীব্র সমালোচনা করেন। এটিকে তিনি সরকারের আত্মঘাতী কৌশল বলে উল্লেখ করেন। 

এরপর ১০ নভেম্বর তিনি আবার লাহোরে ফেরত আসেন। আগের থাকার স্থান ছেড়ে West End Hotel, McLeod Road, Lahore  এই ঠিকানায় থাকা শুরু করেন। এসময় তিনি পশ্চিম পাঞ্জাবের বেশ কিছু নেতার সাথে যোগাযোগ করেন। এদের মধ্যে মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, গোলাম মোহাম্মদ লান্দখোর, পির মানকি শরিফ, খান ইফতেখার হোসেন খান মামদুত, খিলাফাতে পাকিস্তান গ্রুপের আব্দুস সাত্তার নিয়াজি, পশ্চিম পাকিস্তান আঞ্জুমানে মুহাজিরিন এর রাও মেহরোজ আখতার, জিন্নাহ গ্রুপের আখতার মীর, পশ্চিম পাঞ্জাব মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি চৌধুরী মুহাম্মদ ইকবাল ছিমা, পাকিস্তান টাইমসের এসিস্টেন্ট এডিটর নবাবজাদা মাঝহার আলি খান, সর্দার শওকত হায়াত খান, পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সর্দার মোহাম্মদ সাদিক, খাকান বাহার (অল পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশন এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, পিতা- মাঝহার আলি আজহার, সাবেক আহরার নেতা, লাহোর ল কলেজের এল এল বি স্টুডেন্ট) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বেশি কিছু ছাত্রনেতা West End Hotel এ শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে।

৩ ডিসেম্বর ১৯৪৯ তারিখের তার ফিরে যাবার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও তিনি সেটি পরিবর্তন করে ২৭ নভেম্বর করেন। কারণ পূর্ব বাংলা থেকে হামিদুল হক চৌধুরী ও রাগিব হোসেন আসার কথা আছে। তাদের সাথেই অবস্থান করবেন। এছাড়া জানা যায়, মামদুত খানের মামলার দিনে উপস্থিত থেকে দেখার ইচ্ছা আছে।

২০ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে এম এ কাজমি (ল কলেজ স্টুডেন্ট, মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট) শেখ মুজিবকে ডিনারে দাওয়াত করেন। সেখানে অন্যান্য ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে নূর আহমেদ, ফজল-উর রহমান যাকি, যাকা উল্লাহ শাহ এবং ওয়র্কিং কমিটির সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ জাফরের নাম উল্লেখযোগ্য। ডিনারে বক্তৃতা দেবার সময় শেখ মুজিব বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্রদের চেয়ে বেশি প্রগতিশীল। তারা সক্রিয় রাজনীতি করে এবং নির্বাচনে অংশ নেয়। দুইজন ছাত্রনেতা এম এল এ হিসেবেও আছে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্রদেরকেও একইভাবে এগিয়ে আসতে বলেন। কাযমি একটি প্রেস বিবৃতি দেন যা স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। 

নোটঃ পীর মানকি শরিফ -আমিনুল হাসানাত (১৯২২-১৯৬০), পিতা পির আব্দুল রউফ। তিনি উত্তর পশ্চিম সীমান্ত এলাকার ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৫ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। 

Reference: S. Hasina, Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol I 1948-195 Hakkany Publisher’s, 2018.

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

২১ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখের গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান ৩০ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে দিল্লি থেকে বিমানযোগে লাহোর আসেন। বিমান বন্দরের সি আই ডি অফিসারকে আগে থেকে সতর্ক করা হলেও ঐদিন গোয়েন্দা অফিসার তাকে সময়মত সনাক্ত করতে পারে নাই।

ফলে লাহোরে আসার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ সম্ভব হয়নি। শেখ মুজিব মামদুত ভিলায় যান। সেখানে সোহরাওয়ার্দী সাহেব আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন। তবে থাকার জন্য মিয়া ইফতেখার উদ্দিনের বাসায় ব্যবস্থা করা হয়। ঠিকানা, ২১, আইকমান রোড, লাহোর। তার আসার কিছুক্ষণ পর সোহরাওয়ার্দী সাহেব পাকপত্তনের একটি জনসভায় যান। পরের দিন একই যায়গায় তাদের দেখা হয়। সেখানে মামদুত খানের পূর্ব পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে নেয়া ২ লাখ টাকার মামলার ব্যাপারে আলোচনা করেন। টাকাটা খান সাহেব পূর্ব বাংলা থেকে নিয়েছিলেন।

এছাড়া, পশ্চিম পাঞ্জাবে আওয়ামী লীগের শাখা চালু করার সম্ভবনা নিয়েও আলাপ করেন। তবে পরবর্তীতে সাংবাদিকরা শেখ মুজিবের এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটি শুধুই ব্যক্তিগত সফর। এর কোন রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। তবে তিনি জানান, মুসলিম লীগ বর্তমানে জনসংশ্লিষ্টতা হারিয়েছে এবং সরকারি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম পাঞ্জাবে আসন্ন নির্বাচনের আগে সেখানে আওয়ামী লীগের শাখা চালুর ব্যাপারে তিনি মত দেন। তিনি বলেন, এর ফলে সরকারের জবাবদিহিতা বাড়ানো যাবে এবং উন্নত দেশের মত এখানেও একটি সুস্থ বিরোধী রাজনৈতিক চর্চা সম্ভব হবে। সরকার কর্তৃক পূর্ব বাংলা ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যে নিপীড়ন চালানো হচ্ছে তার প্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

শেখ মুজিব আর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে এই ব্যাপারে কথা বলতে তিনি করাচী যাবার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন। পশ্চিম পাকিস্তান আসার পর কিছুদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন।  ২১ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে আই বির সহকারী পরিচালক ঢাকায় একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট পাঠান, যাতে শেখ মুজিবের ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গোলাম মোহাম্মদ লান্দখোরের (Lundkhore) সাথে রাওয়ালপিণ্ডিতে এক বৈঠকের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়। এটি ৭ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুজনেই চম্বলপুরে পির মানকি শরিফের সাথে দেখা করতে যান। সেখানে ৯ নভেম্বর তারিখে রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। এতে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০ জন নেতাকর্মীকে সরকার কর্তৃক আটক করার বিষয়টি তোলেন।

এই আটক সরকারি অর্ডিনেন্সের অবৈধ প্রয়োগ, উল্লেখ করে শেখ মুজিব বলেন, অতি স্বত্বর পশ্চিম পাঞ্জাব ও সিন্ধে আওয়ামী লীগের শাখা খুলতে হবে। সরকার পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দমনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার তীব্র সমালোচনা করেন। এটিকে তিনি সরকারের আত্মঘাতী কৌশল বলে উল্লেখ করেন। এরপর ১০ নভেম্বর তিনি আবার লাহোরে ফেরত আসেন।

আগের থাকার স্থান ছেড়ে West End Hotel, McLeod Road, Lahore-8211; এই ঠিকানায় থাকা শুরু করেন। এসময় তিনি পশ্চিম পাঞ্জাবের বেশ কিছু নেতার সাথে যোগাযোগ করেন। এদের মধ্যে মিয়া ইফতেখার উদ্দিন, গোলাম মোহাম্মদ লান্দখোর, পির মানকি শরিফ, খান ইফতেখার হোসেন খান মামদুত, খিলাফাতে পাকিস্তান গ্রুপের আব্দুস সাত্তার নিয়াজি, পশ্চিম পাকিস্তান আঞ্জুমানে মুহাজিরিন এর রাও মেহরোজ আখতার, জিন্নাহ গ্রুপের আখতার মীর, পশ্চিম পাঞ্জাব মুসলিম লীগের জেনারেল সেক্রেটারি চৌধুরী মুহাম্মদ ইকবাল ছিমা, পাকিস্তান টাইমসের এসিস্টেন্ট এডিটর নবাবজাদা মাঝহার আলি খান, সর্দার শওকত হায়াত খান, পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সর্দার মোহাম্মদ সাদিক, খাকান বাহার (অল পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশন এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, পিতা- মাঝহার আলি আজহার, সাবেক আহরার নেতা, লাহোর ল কলেজের এল এল বি স্টুডেন্ট) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

এছাড়া বেশি কিছু ছাত্রনেতা West End Hotel এ শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে। ৩ ডিসেম্বর ১৯৪৯ তারিখের তার ফিরে যাবার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও তিনি সেটি পরিবর্তন করে ২৭ নভেম্বর করেন। কারণ পূর্ব বাংলা থেকে হামিদুল হক চৌধুরী ও রাগিব হোসেন আসার কথা আছে। তাদের সাথেই অবস্থান করবেন। এছাড়া জানা যায়, মামদুত খানের মামলার দিনে উপস্থিত থেকে দেখার ইচ্ছা আছে।  

২০ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে এম এ কাজমি (ল কলেজ স্টুডেন্ট, মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট) শেখ মুজিবকে ডিনারে দাওয়াত করেন। সেখানে অন্যান্য ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে নূর আহমেদ, ফজল-উর রহমান যাকি, যাকা উল্লাহ শাহ এবং ওয়র্কিং কমিটির সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ জাফরের নাম উল্লেখযোগ্য। ডিনারে বক্তৃতা দেবার সময় শেখ মুজিব বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্রদের চেয়ে বেশি প্রগতিশীল।

তারা সক্রিয় রাজনীতি করে এবং নির্বাচনে অংশ নেয়। দুইজন ছাত্রনেতা এম এল এ হিসেবেও আছে। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের ছাত্রদেরকেও একইভাবে এগিয়ে আসতে বলেন। কাযমি একটি প্রেস বিবৃতি দেন যা স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নোটঃ পীর মানকি শরিফ -আমিনুল হাসানাত (১৯২২-১৯৬০), পিতা পির আব্দুল রউফ। তিনি উত্তর পশ্চিম সীমান্ত এলাকার ধর্মীয় নেতা হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৫ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। 

References:  S. Hasina, Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol I 1948-1950. Hakkany Publisher’s, 2018.

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

১৯৭৩ সালের শেষের দিকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার আলজিয়ার্স নগরীতে আয়ােজিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যােগদান করলেন।

উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত হলেন ড. কামাল হােসেন, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, মামী শামসুল হক, রাজনৈতিক সচিব তােফায়েল আহম্মদ, দৈনিক জনপদ সম্পাদক আবদুল গাফফার চৌধুরী, বাংলাদেশ অবজারভার সম্পাদক ওবায়দুল হক এবং রাষ্ট্রদূত আরশাদুজ্জামান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

ভারতবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কোলকাতার ব্রিগেডগ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২
কোলকাতা
আমার ভাই ও বোনেরা, 

আপনাদের আমি সাড়ে সাত কোটি বাঙালিদের পক্ষের থেকে শুভেচ্ছার বাণী বহন করে নিয়ে এসেছি। কৃতজ্ঞতার বাণী বহন করে নিয়ে এসেছি। (করতালি)। আপনারা জানেন যে,  ৭ কোটি বাঙ্গালি কীভাবে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছে। আমি আপনাদের যদি কৃতজ্ঞতা জানাতে চেষ্টা করি অন্যায় করা হবে,  কারণ,  পাকিস্তানের নরপশুর দল,  পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দল,  আমার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে,  দুনিয়ার ইতিহাসে তার কোন জাগাতে তার তুলনা হয় না। আইজ আমার গ্রামে-গ্রামে গৃহহারার আর্তনাদ। আইজ আমার গ্রামে গ্রামে সর্বহারার আর্তনাদ। আইজ আমার মানুষ পথের ভিখারি,  আজ আমার মা-বোনদের ইজ্জত নষ্ট করা হয়েছে। আমার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার প্রায় ১ কোটি লোক দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। যদি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী,  আপনাদের মহান নেতা,  ভারতের জনসাধারণ,  পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ,  ত্রিপুরার জনসাধারণ,  মেঘালয়ের জনসাধারণ,  আসামের জনসাধারণ তাদের স্থান না দিতো,  তাদের খাবার না দিতো,  তাদের আশ্রয় না দিতো,  তাদের সান্ত্বনা না দিতো,  তাদের অবস্থা কী হতো? আমি যদি কৃতজ্ঞতা না প্রকাশ করি তাহলে শ্রীমতী গান্ধী অন্যায় করা হবে। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা জানাতে পারি, এর বেশি জানাতে পারি না। (জনতার করতালি) আপনাদের এই দান কোনদিন আমরা শোধ করতে পারবো না। স্বাধীনতা পেয়েছি,  বড় রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি। এত রক্ত,  কোনও জাত,  কোনও দেশে,  কোনও দিন দেয় নাই,  যা আমার বাংলাদেশের মানুষ দিয়েছে। না হলেও ৩০ লক্ষ লোক জীবন দিয়েছে। শতকরা চল্লিশখানা ঘর আমার বাংলাদেশে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কার্ফ্যু আইন জারি করে আমার জ্ঞ্যানি জ্ঞ্যানি জ্ঞ্যানি গুণী,  বৈজ্ঞানিক,  শিক্ষাবিদদের হত্যা করা হয়েছে। আমার এক কোটি লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আমার সহকর্মীরা আপনাদের দুয়ারের কাছে,  আপনাদের কাছে এসেছে ভেগে,  জানের ভয় পেয়ে সংগ্রাম করার জন্য। সংগ্রাম তারা করেছে মানুষের মত সংগ্রাম করেছে। আমি যা বলেছি… আমি তাদের যাওয়ার সময়় অস্ত্র দিতে পারি নাই। আমাকে যখন তারা…গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়,  আমি জানতাম না আমি মাতৃভূমিতে ফিরে আসতে পারবো কিনা; কিন্তু আমার মানুষকে আমি বলে গিয়েছিলাম সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য… আমার কথা তারা রেখেছে। গত বার ৭ই মার্চ তারিখে আমি জানতাম পৈশাচিক বাহিনী আমার মানুষের আক্রমণ করবে। আমি বলেছিলাম,  আমি যদি হুকুম দেবার না পারি,  তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ তৈয়ার করো। আমি বলেছিলাম যা কিছু আছে সবকিছু দিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করো। আমি বলেছিলাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমার লোকেরা জাতি-ধর্মনির্বিশেষে বৃদ্ধ থেকে বালক পর্যন্ত সকলেই সংগ্রাম করেছে। এ সংগ্রাম কামিয়াব হতে পারতাম না ভারতের জনসাধারণ,  ভারতের সরকার,  ভারতের সামরিক বাহিনী,  আর শ্রীমতি গান্ধীর নেতৃত্বে এগিয়ে না আসতো। আমি আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি আপনাদের শুভেচ্ছা জানাই। আমার দেবার মতো কিছুই নাই,  শুধু আমি এইটুকু দিতে পারি,  নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি দেবার কিছু নাই,  আছে শুধু ভালোবাসা,  দিলাম শুধু তাই। 

ভাইয়েরা আমার,
আমাদের যে সংগ্রাম আজ থেকে শুরু হয় নাই। আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে। কলকাতার কথা বলছি,  এই জাগা আমি লেখাপড়া করেছি। এই মাটির সঙ্গে আমার সম্বন্ধ বহুদিনের ছিলো। কিন্তু আমরা যদিও দু’দেশ হয়েছিলাম কিন্তু এমন একটা চক্রের হাতে পড়েছিলাম যে আপনাদের সঙ্গে আমরা সম্বন্ধ রাখতে পারি নাই,  তারা শুধু আমার স্বাধীনতা হরণ করে নাই,  তারা আমার মাতৃভাষার ওপর আঘাত করেছিলো। তারা আমার সংস্কৃতির ওপর আঘাত করেছিলো। তারা শুধু তাই করে নাই,  শোষণ করে বাংলাকে সর্বস্বান্ত করেছিলো। আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম,  বার বার মোকাবিলা করেছি। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন আপনাদের জানা আছে। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে আমার ছেলেরা জীবন দিয়েছিলো। ১৯৫৪ সালে যখন সামান্য গণতন্ত্র সবাই আশা করলাম,  সেই দিন আমার আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিলো,  আমাকে গ্রেপ্তার করেছিলো,  অনেক বন্ধুর বোধ হয় জানা আছে করাচী থেকে যখন আমি ঢাকায় পৌছি,  কলকাতায় কয়েক মিনিট আমি ছিলাম তারা জানতো তার কয়েক ঘণ্টা পরেই ঢাকার শহরে আমি গ্রেপ্তার হই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারি করেন পাকিস্তানে। এই আইন করা হয়েছিলো বাংলাকে শোষণ করার জন্য,  এই আইন করা হয়েছিলো বাংলাকে কলোনি করার জন্য,  এই সামরিক আইন করা হয়েছিলো বাংলার মানুষকে পথের ভিখারি করার জন্য,  আমরা রুখে দাড়িয়েছিলাম। আমার ভাইয়েরা জীবন দিয়েছিলো। আমরা কারাবরণ করেছিলাম। কিন্তু বাংলার মানুষ,  আপনারা খবর না পেলেও,  বাংলার মানুষ মাথানত করে নাই। বাংলা মানুষ সংগ্রাম চালিয়েছিলো এবং সংগ্রাম চালিয়েছিলো ১৯৬২ সালে আমার ছেলেদের ওপর গুলি চালালো। ১৯৬৪ সালে আমার ছেলেদের মা-বোনদের উপর গুলি চালালো,  ১৯৭০ সালে ইতিহাস আপনারা জানেন। আপনাদের কাছে কী বলবো? এ সংগ্রাম আজ থেকে শুরু হয় নাই। বহুদিন থেকে শুরু হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের তিনটা আদর্শ ছিলো। সেই আদর্শ সভ্য জগতে চলতে পারে না। কী ছিলো তাঁদের আদর্শ? ভাগ করে দুটো দেশ হয়েছে; তাদের একমাত্র স্লোগান ছিল সব নেতাদের এসলাম কাত্রামে হ্যাঁয়,  কাশ্মীর কো ফতে পারণে কারেগা,  হিন্দু হামারা দুশমন হ্যায়,  আর কোনও স্লোগান নাই। আর কোনও আদর্শ নাই। মানুষ না খেয়ে মরছে,  তার কথা বলবে না। মানুষ… কতোটা মানুষ পথের ভিখারি হচ্ছে তার কথা বলবে না। দুঃখি মানুষের গায়ে কাপড় নাই তার কথা বলবে না। হিন্দুস্থান আমার শত্রু। হিন্দুস্থান কেন আমার দুশমন হবে? ভারতবর্ষ কেন আমার দুশমন হবে? তারা তো আমার ভাই। তাদের সঙ্গে আমরা ভাই হিসেবে বাস করবো। এর মধ্যে বাংলায় প্রতিবাদ উঠেছে। কিন্তু আমরা … আপনারা জানেন যে ২৩ বৎসর পর্যন্ত শতকরা ৯৬ জন লোক আমাদের সারা পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে সামরিক বাহিনীতে নেয়া হতো। বাঙ্গালিদের সামরিক বাহিনীতে নেওয়া হতো না। কারণ বাঙ্গালি হাতে অস্ত্র পাইলে তারা… তাদের উপায় ছিলো না। তাই বাঙালিদের অস্ত্র দেওয়া নিষেধ ছিলো। আমার মতো মানুষও যদি একটা বন্দুক লাইসেন্স দিতে হতো তাহলে দশবার ঘুরে একটা লাইসেন্স করতে হতো। মনে করেছিলো বন্দুক দিয়েই বাংলাদেশকে দাবায় রাখবে। আহাম্মকের দল জানে না যে জাতি একবার জেগে ওঠে,  সে জাতি মুক্তি পাগল,  যে জাতি স্বাধীনতাকে ভালোবাসে,  সে জাতিকে বন্দুক-কামান দিয়ে দাবায় রাখা যায় না- আহাম্মকের দল তা জানে না। ইতিহাস তারা পড়ে না।

ভাইরা আমার,
তাই আপনারা জানেন,  যা কিছু সামান্য আমার পুলিশের লোক ছিলো তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে,  শতকরা ৬০ জন বাঙ্গালি পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। যা কিছু আমার সামরিক বাহিনীর লোক ছিলো,  তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যা কিছু আমার শিক্ষিত লোক ছিলো তাদের অনেককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রাস্তা বাংলাদেশে নাই,  শেষ করে দিয়ে গেছে। শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবেন যে,  যাওয়ার আগে যতগুলো খাবার গুদাম ছিলো,  যার মধ্যে আটা,  ময়দা,  চাউল ছিলো তা পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। কী অবস্থায় আমাদের ফেলে গেছে তারা। আমি নিশ্চয়ই মোবারকবাদ জানাবো,  স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীমতি গান্ধীর সরকার এবং ভারতের জনসাধারণ আমাদের সাহায্য দিয়েছেন,  যাতে অন্তত পক্ষে আমার লোকগুলো দাঁড়াতে পেরেছে। তবে একথা সত্য আমার লোক না খেয়ে সংগ্রাম করেছে,  আমার লোক দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে,  কিন্তু আমার লোকের একতা আছে এবং আমি বিশ্বাস করি যে,  একতাবদ্ধভাবে যদি আমি সংগ্রাম করি তা আমার দেশকে গঠন করার জন্য,  বিশ্বাস করি সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ আবার জেগে উঠবে। কেউ দাবায় রাখতে পারবে না। বাংলার মাটি বড় সুন্দর মাটি। বাংলার মাটি পলি মাটি। বর্ষাকালে বাংলার মাটি বড় নরম হয়ে যায়। আমি একবার এই বক্তৃতা করেছিলাম পল্টন ময়দানে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলাম যে,  ভুলে যেয়ো না,  এই বাংলা তিতুমীরের বাংলা। ভুলে যেয়ো না এই বাংলা সূর্যসেনের বাংলা,  ভুলে যেয়ো না,  এ নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের বাংলা,  ভুলে যেয়ো না এই বাংলা ফজলুল হকের বাংলা,  ভুলে যেয়ো না এ বাংলা সোহরাওয়ার্দীর বাংলা,  এই বাংলা যেমন পলি মাটির বাংলা,  চৈত্র মাসের প্রখর রৌদ্রের সময় এই বাংলার মাটি এমন শক্ত হয় যার আঘাতে অনেকের মাথা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। তারা আমার কোথা মানেনাই। তারা বারবার আমাকে …একবার আমাকে করল আগরতলা মামলার আসামি,  আমাকে ফাঁসি দেবে,  দিতে পারলো না। বাংলার মানুষ আমাকে কেড়ে আনলো ওদের কয়েদ খানার থেকে। এবার আমি আপনাকে মোবারকবাদ জানাই বেশি করে মিসেস গান্ধী,  আমাকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়েছিলো,  আমাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য তারা সমস্ত কিছু ঠিক করে ফেলেছিলো,  আমি জানি আপনি দুনিয়ার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন,  আপনি দেশে দেশে ঘুরেছেন,  আমার দুঃখী মানুষের জন্য,  ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য। এজন্য আপনাকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার দুঃখ ছিলো না,  আমি মরবার জন্যই প্রস্তুত হয়ে হুকুম দিয়েছিলাম। মৃত্যু স্বাভাবিক,  বেঁচে থাকাই অস্বাভাবিক। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম যে আমার বাংলাদেশের মানুষকে পশ্চিমা শোষক গোষ্ঠী এবং দানব গোষ্ঠী দাবায় রাখতে পারবেনা। দুনিয়ার অনেক দেশ আমাদের সহানুভূতি দেখিয়েছে। সোভিয়েত রাশিয়া আমাদের সহানুভূতি দেখিয়েছে। বা ইংরেজ গ্রেট ব্রিটেনের জনসাধারণ… অন্যান্য জনসাধারণ আমাদের সহানুভূতি দেখিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। এমেরিকার জনসাধারণ এবং তাঁদের সাংবাদিকরা আমাদের অনেক সমর্থন করেছেন আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। কিন্তু এমেরিকার সরকারকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারবোনা। ভারত যখন এগিয়ে এলো আমার জনসাধারণকে সাহায্য করার জন্য,  যখন আমার গ্রামে গ্রামে হত্যাকাণ্ড চলছিলো,  যখন দুধের বাচ্চারদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছিলো,  এমেরিকান গভারমেন্ট কি জানতেননা সে খবর?! তার মেশিনারি আমার বাংলায় ছিলো। তারা জানতেন। কেমন করে তিনি অস্ত্র দিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্য বাহিনীর হাতে? কেমন করে তিনি ভারতবর্ষে সাহায্য বন্ধ করে দিলেন? ভারতের জনসাধারণও দুঃখী জনসাধারণ। তাদেরও কষ্ট আছে। তাঁরাও তাঁদের মুখের গ্রাস ভাগ করে আমার বাংলার মানুষকে খাইয়েছে। সেই সময় তাঁদের সাহায্য বন্ধ করার অর্থ কী? ৭ কোটি লোকের বাজার রাখার জন্য? আপনাদের দালালরা পশ্চিম পাকিস্তানের দালালরা বাংলাদেশকে বাজার রাখবে? এই উদ্যেশ্যে? আমি এমেরিকার সরকারকে … আমি তার বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইনা- এইটুকু বলতে চাই আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারলাম না। আর আপনাদের অনুরোধ করছি,  আপনারা গণতন্ত্রের কথা বলেন,  মুখে মুখে,  মেহেরবানি করে গণতন্ত্রের কথা না বলে গণতন্ত্র যেভাবে চলে সেই দিকে একটু খেয়াল রাখুন। সিরিয়ায় সাম্রাজ্যবাদীর দিন চলে গেছে,  ভারতবর্ষেও আর বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীর খেলা চলবেনা এ বিশ্বাস আমার আছে।   

ভায়েরা আমার, 
নীতির জন্য সংগ্রাম করেছিলাম। আইজ আমার দেশ স্বাধীন। আইজ আমার দেশ সর্বভৌম। বিশ্বাস করেন,  পশ্চিম পাকিস্তানের গরিব ভাইদের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলার নাই,  আমি চাই তারা সুখে থাকুক,  আমি প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করিনা। কিন্তু,  তাঁরা যদি মনে করে থাকেন এখনো বিদেশে ঘুরে ঘুরে বলেন যে বাংলাদেশ তাদের অংশ তাহলে বাধ্য হয়ে আমাকে বলতে হবে  তাঁদের পাগলা গারদে ছাড়া তাদের কোন জাগায় স্থান নাই। (জনতার করতালি)। আমরা ছিলাম সংখ্যায় বেশি,  আমরা ঘোষণা করেছি আমার দেশ স্বাধীন,  তুমি কোন জাগার মাদবার হয়ে পড়লা তুমি বলছো বাংলাদেশ তোমাদের অংশ! ভুলে যাও বন্ধু,  সুখে থাকো বন্ধু। বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশ সার্বভৌম রাষ্ট্র। বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে। তোমার ক্ষমতা নাই বাংলার স্বাধীনতা হরণ করতে পারো। বিনা অস্ত্রে যদি আমার বাংলার মানুষ আমার অনুপস্থিতিতে সংগ্রাম করে স্বাধীনতা নিয়ে থাকতে পারে- আইজ বাংলাদেশকে যদি ষড়যন্ত্র করতে চাও,  আর কোনও খেলা খেলতে চাও মনে রেখো ৭ কোটি বাঙালির একটা প্রাণ বেঁচে থাকতে বাংলার মাটিতে ঢুকবার ক্ষমতা তোমাদের নাই। আমি জানি তোমরা সাপ। আমার জানার আছে। সেই জন্য কবিগুরুর একটা কবিতা পড়তে হয়। যে নাগিণীরা চারদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,  শান্তির দ্বৈত বাণী শুনাইবে ব্যর্থ পরিহাস,  যাবার বেলায় ডাক দিয়ে যাই,  দানবের তরে লড়িবারে প্রস্তুত হতে হবে ঘরে ঘরে। আমার বাঙালি প্রস্তুত আছে। নাগিণীদের আমরা চিনি,  ভয় নাই। আমাদের নীতি আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে,  যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দুনিয়ায় দুনিয়ায় ঘুরে আপনার জন্য মুক্তি কামনা করেন আর বাংলার স্বাধীনতার অনুরোধ করেন ব্যাপারটা কী? আমি বলি ব্যাপারটা পরিষ্কার এবং সোজা আপনারা যদি বুঝতে চান বুঝতে পারেন,  বুঝবার চান না বলেই বোঝেন না। এটা হলো নীতির মিল,  এটা হলো আদর্শের মিল। আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্রে,  তিনি বিশ্বাস করেন গণতন্ত্রে। আমি বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে,  তিনি বিশ্বাস করেন সমাজতন্ত্রে। আমি বিশ্বাস করি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র,  তিনি বিশ্বাস করেন ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। আমি বিশ্বাস করি জাতীয়তাবাদ,  তিনি বিশ্বাস করেন জাতীয়তাবাদ। এটা নীতির মিল,  এটা আদর্শের মিল। এ জন্য হয়েছে আমাদের বন্ধুত্ব। ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব অটুট থাকবে। কেউর ক্ষমতা নাই আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারে। ভাইয়েরা আমার, আমি ও আমার দেশে সাম্প্রদায়িকতা বাংলার বুকে নাই আপনারা দেখেছেন। ভারতের জনসাধারণকে আমি অনুরাধো করবো যে ভারতের বুকে যেন সাম্প্রদায়িকতার বীজ আর না আসে। কারণ,  এটা মনুষ্যত্বের বাইরে। এটা মানবতার বাইরে। এটা যে কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে। সেই জন্যই ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র,  যেখানে বলা হয় তা পুরাপুরি আপনাদের পালন করতে হবে। আমি আপনাদের কোনো রকমের অ্যাডভাইস দিতে চাই না,  আমি শুধু বলতে চাই,  কারণ আমার অনেক সময় আমি দেখেছি,  যখন আমি বাংলার জাতীয়তাবাদ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এসেছি তখন মাঝে মাঝে পশ্চিম পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রকারীরা পূর্ব বাংলায় চেষ্টা করেছে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করতে। তার ফল হয়েছে ভারতবর্ষে যাতে আমার আন্দোলন অনেক পিছিয়ে গেছে। সেই জন্যই আপনাদের কাছে আমার আমাদের আবেদন থাকবে। আর আমি আপনাদের এই আশ্বাস দিতে পারি যে বাংলাদেশ চারটি স্তম্ভের ওপর চলবে। জাতীয়তাবাদ,  সমাজতন্ত্র,  গণতন্ত্র,  আর ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এর মধ্যে কোনও কিন্ত ফিন্ত নাই। এর মধ্যে কেউ হাত লাগাতে পারবেনা। এটা সোজাসুজি আমরা করবো। আর আপনারা জানেন আমি সোজা মানুষ। সোজা কথা বলি। যা বলি সেটা বুঝি,  সেটা বলি এবং সেটা করি। এর মধ্যে আমি ভয়ও করি না কাউকে কিছু করিনা। আমার মানুষ বড় সোনার মানুষ। সোনার বাংলা সত্যিই সোনার বাংলা। তাই আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত করেছি- সোনার বাংলা তোমায় বড় ভালোবাসোি। তাই আমি আপনাদের সকলকে আবার আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেওয়ার সমা বলে যাই আপনাদের বন্ধুত্ব অটুট এবং অক্ষয় থাকবে।

আপনারা আমার সঙ্গে স্লোগান দ্যান।
জয় ভারত,  জনতা একসাথে,  
“জয় ভারত” জয় ভারত,  জনতা একসাথে,
“জয় ভারত” জয় বাংলা,  জনতা একসাথে,
“জয় বাংলা” জয় বাংলা,  জনতা একসাথে,
“জয় বাংলা” জয় শ্রীমতি গান্ধী, জনতা একসাথে,
“জয় শ্রীমতি গান্ধী” জয় শ্রীমতি গান্ধী,  জনতা একসাথে,

“জয় শ্রীমতি গান্ধী” আমি যদি বলি বাংলাদেশ-ভারতবর্ষ,  আপনারা বলবেন অমর হোক।বাংলাদেশ- ভারতবর্ষ,  জনতা একসাথে,  “অমর হোক”।বাংলাদেশ- ভারতবর্ষ,  জনতা একসাথে,  “অমর হোক”। 

Reference: বঙ্গবন্ধুর অডিও ভাষণ, পিপলস ভয়েস, প্রকাশনাঃ শেকড় সন্ধান।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

বঙ্গবন্ধু ভারত সফরকালে বাংলাদেশি শরণার্থীদের উদ্দেশে এই ভাষণ দেন।

৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২
কোলকাতা
"আজ আমার ভাই-বোনদের উদ্দেশে কলকাতায় এসে দুটো কথা বলার সুযোগ পেয়ে আমি আনন্দিত। আপনারা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন বলেই মহাঘাতক এহিয়ার বর্বর বাহিনী আপনাদের বাধ্য করেছিলো বাংলার শান্তির নীড় ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিতে। আমি জানি ঘাতক পাকিস্তানি বাহিনী আপনাদের বিষয়সম্পত্তি লুট করেছে। হত্যা করেছে আপনাদের বাপ-ভাই সন্তানদের। ইজ্জত নষ্ট করেছে আমার মা-বোনদের। কিন্তু দেশের ডাকে তবু আপনারা আনন্দচিত্তে সাড়া দিয়েছেন। নিজেদের অপরিসীম ক্ষয়ক্ষতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেননি। আপনারা চরম ক্ষতি স্বীকার করেছেন। চরম মূল্য দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। দেশবাসীর পক্ষ থেকে তাই আমি আপনাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনারা জানেন,  আমাদের দুর্দিনে ভারতের সুযোগ্য প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্ধিরা গান্ধী,  তার সরকার ও ভারতের জনসাধারণ নিপীড়িত বাংলার জনসাধারণকে সর্বপ্রকার সাহায্য দিয়েছেন। তারা আপনাদের আশ্রয় দিয়েছেন,  আহার যুগিয়েছেন,  বস্ত্র দিয়েছেন,  সান্ত্বনা দিয়েছেন,  রোগে-যতনায় শুশ্রূষা করেছেন। আমি তাদের আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। তাঁরা আমাদের জন্য সম্ভব সব কিছু করেছেন। তাদের এই মহানুভবতা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। আজ স্বাধীন বাংলাদেশের ৬০ লক্ষ শরণার্থী ফিরে এসেছেন। বাংলার মুক্ত মাঠ-ঘাট আপনাদের দুবাহু বাড়িয়ে স্বাগতম জানাচ্ছে। আমার সর্নিবন্ধ অনুরোধ। আপনারা দেশে ফিরে আসুন। নিজেদের ঘর আবার গড়ে তুলুন ও বাংলাদেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠিত করুন। আমার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল আমি আপনাদের সাথে যেয়ে দেখা করবো। কিন্তু সময় বড় সংক্ষিপ্ত। এখন প্রধান কাজ দেশ গঠন ও আপনাদের পুনর্বাসন করা। আর আপনারা যে যার ঘরে ফিরে যান।

সেখানেই আমি আপনাদের সাথে দেখা করবো। আপনাদের শুভ কামনা করে আমি বাংলাদেশের শ্যামল জনপদে আপনাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাচ্ছি।জয় বাংলা।

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

প্রেসিডেন্ট গিরির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ 
ভারত 

"For me, this is a most gratifying moment,  I have decided to stop over in this historic capital of your great country on my way back to Bangladesh. For this is the least I can do to pay personal tribute to the best Friends of my people,  the people of India and their Government under the leadership of your magnificent prime Minister,  Mrs Indira Gandhi,  (cheers). She is not only a leader of men, but also of mankind. You all have worked so untiringly and sacrificed so gallantly in making this journey possible this journey form darkness to light,  form captity to freedom,  form desolation to hope.

I am at last going to sonar Bangla, the land of my derms, after a period of nine months. In these nine months,  my people have traversed centuries.When I was taken away from my people,  they wept,  when I was held in captivity,  they fought and now that I go back to them,  they are victorious. I go to join my people in the tremendous tasts that now lie ahead in turning victory into a road of peace,  progress and prosperity. I go back not with any hatred in any heart for anyone,  but with the satisfaction that truth has at last triumphed over falsehood,  sanity over insanity,  courage over cowardice,  justice,  good over evil,  joi bangla,  jai Hind.  

Reference: Trivedi, R. (1999) International Relations of Bangladesh and Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman [Documents, Messages and Speeches] Volume-I p.54-55 Dhaka, Parama

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

৪ ডিসেম্বর ১৯৪৮ এর গোয়েন্দা রিপোর্টে জানা যায়, ১ ডিসেম্বর ১৯৪৮ তারিখে বাগেরহাটের দৌলতপুর কলেজের সবুর ক্যাম্পের মুসলমান ছাত্ররা প্রোপাগান্ডামূলক কাজ করার জন্য পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা (মুসলিম লীগের প্রো-কমিউনিস্ট গ্রুপের ছাত্রদের বিদ্রোহী গ্রুপ) শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমে দৌলতপুর কলেজের প্রিন্সিপ্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে রাজনৈতিক সভার অনুমতি দিতে চায় নাই। কিন্তু তাকে আশ্বস্ত করা হয় এখানে শিক্ষা সংরান্ত বিষয়েই আলোচনা করা হবে। পরে তিনি অনুমতি দেন। মিটিং শুরু হবার সাথে সাথে মৌলভি আব্দুল হামিদ (ভাসানী) এর গ্রুপ থেকে এ এস এম তামিদুদ্দিনের নেতৃত্বে হলে প্রবেশ করে এবং মিটিং পণ্ড করতে চেষ্টা করে। এতে হাতাহাতি শুরু হয়। তামিদুদ্দিনের ডান চোখ কেটে যায়।

তখন এই গ্রুপের আমজাদ হোসেন ও অন্যান্যরা অভিযোগ করে যে তামিদুদ্দিন ছুরিকাহত হয়েছে। একটি মামলা করা হয়। মামলা নং u/s/147/324 I.P.C রেজিস্ট্রেশন করা হয়। ঘটনার পরে বিনা বাঁধায় মিটিং শেষ হয়। বক্তব্যে শেখ মুজিব সরকারের ফুড পলিসি নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রাথমিক শিক্ষার অবস্থা নিয়ে সমালোচনা করেন। পূর্ব বাংলার সব কলেজে মিলিটারি ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করার আহ্বান করেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অহরহ বিমানে ভ্রমণ করে দেশের প্রচুর টাকা নষ্ট করছেন। এছাড়া ছাত্রদের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবী করেন, এবং জমিদারি প্রথা বন্ধের আহ্বান করেন। সরকার থেকে জমিদারদের প্রায় ৪০ কোটি রুপী ভুর্তুকি দেয়া হচ্ছে যার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এর মধ্যে ৩০ কোটি রুপী ভারতে চলে যাবে। অথচ এই টাকা দিয়ে অস্ত্র কিনে দেশের প্রতিরক্ষা খাত উন্নত করা সম্ভব। এদিকে শিক্ষা খাত ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। তিনি বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার দাবী জানান।

বাগেরহাটের মুসলিম ছাত্রলীগের আব্দুল আজিজের গ্রেপ্তারি পরওয়ানা বাতিলের দাবী জানান। মিটিং এ আরও উপস্থিত ছিলেন,  ১। আমজাদ আলী গোরাল ২। আবুল মনসুর আহমেদ (পিতা –কাশেম আলী, পাতাসি, পিরোজপুর, বরিশাল) ৩। নূর আলী সরদার (পিতা- মোঃ ইসমাইল, পানিয়া, কালীগঞ্জ, খুলনা) ৪। ওমর ফারুক ৫। আব্দুল আজিজ বি এ (পিতা – হাজি আফিজুদ্দিন, তেলিগাতি, মোরেলগঞ্জ, খুলনা)।  

নোটঃ বাধ্যতামূলক মিলিটারি ট্রেনিং সিস্টেম বিশ্বের ২৬ টি বলবত আছে। এরমধ্যে ইজরাইল, নর্থ কোরিয়া, নরওয়ে উল্লেখযোগ্য। [1, pp. 52–55]

References:  S. Hasina, Secret Documents of Intelligence Branch on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Vol I 1948-1950. Hakkany Publisher’s, 2018.

উত্তরটি শুনতে এখানে ক্লিক করুন

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি প্রয়াস

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, জাতির মহান সন্তান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে চট্টগ্রামের উন্নয়নের
সকল প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণে, জনগণের সকল সমস্যা সমাধান ও জীবন মান উন্নয়নে কাজ করছি, করে যেতে চাই আজীবন।
-- এম জহিরুল আলম দোভাষ, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)